follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

একাকী মায়ের সংগ্রাম আর পথচলা

এই শহরে একাকী মায়ের সংগ্রাম আর মাতৃত্বের অদেখা, অজানা এক গল্প তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2017/11/cinmoyee_single-mom.jpg

তপ্ত পীচের উপর হাঁটতে হাঁটতে বাস স্টপেজে পৌঁছায় নীতু (ছদ্মনাম)। গন্তব্য একটা দৈনিক পত্রিকা অফিস। বাসের সীটে বসে প্রচণ্ড গরমে ঘামতে থাকে সে। নীতুর মনে হয় এই তো সেদিন ঋদ্ধকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে  ‘সেপারেটেড’ শব্দটায় টিক দিতে খানিকক্ষণ চুপ হয়েছিল সে। কাগজে কলমে তাকে লিখতে হয়েছে রাষ্ট্র কাঠামোর কোন ধর্ম ছোট্ট তিন বছরের শিশুটা পালন করে। কী বিচিত্র সমাজ কাঠামো। ভাবতে ভাবতে স্কুল করিডোরে ফেলে আসা ঋদ্ধের মামণি ডাকের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এক সময় সে ডাকের প্রতিধ্বনি এই ব্যস্ততম শহরের শব্দের আড়ালে কখন যেন থিতিয়ে যায়। এতোটুকুন স্বস্তি শুধু আঁকিবুঁকি –ছড়া-গানের মধ্যে কিছুটা সময় খুউব আনন্দে কাটবে ঋদ্ধের সময়টা। বেলাশেষে ফিরতি পথে নীতু চুপচাপ শুধু দেখতে থাকে এ শহরে মানুষ শুধু ছুটছে। চার দেয়ালের বাইরের এ নগর জীবনের সাথে পরিচিত সে তবে অভ্যস্ত নয়। এ শহরে নতুন সে।

আটপৌরে একটা দালানে দোতলায় ছোট্ট দুইটা ঘর ভাড়া নেয় নীতু। একেবারে স্টুডিও ঘর। প্রায়ই ঘুমোতে যাবার আগে ছেলের মুখে অপলক চেয়ে থাকে সে। কত শত প্রশ্নেরা ভীড় করে। মাথাগোঁজার দুটো ঘরের জন্য কত কত টু-লেট দেয়া বাসা দেখে বিষণ্ণ মুখে ফিরবার কথা মনে হয় তার।

এ শহরে সেপারেটেড একজন মাকে কবি বা কস্টিউম ডিজাইনার কিংবা অভিনেত্রী হওয়ার জন্য একা বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে কতটা অপমানিত হতে হয়। ভাবতে থাকে কিভাবে আধুনিকতার লেবাসে পুরুষতন্ত্রের মুখোশ পরে আছে শত শত মানুষ।

মুখিয়ে থাকা হায়নাদের লোমশ থাবা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত। কী সাংঘাতিক যুদ্ধ।এক সময়কার ভালোবাসার মানুষের মুখটা অস্পষ্ট হতে থাকে । আদল বদলে যায়।ফেলে আসা সংসারের কথা মনে পড়ে। মা ছেলের কত দুষ্টুমিমাখা কত গল্প গাঁথা আছে ফেলে আসা ছাদের লাল ইটের ভাঁজে ভাঁজে। মনে পড়ে ছাদের সেই বিকেল্গুলোর কথা, মনে পড়ে ঋদ্ধের প্লেনে করে সমুদ্র দেখতে যাবার গল্প কিংবা এক ঝাঁক টিয়াপাখি দেখে ঋদ্ধের আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছের কথা……ঘরের পাশের ছোট্ট ব্যাল্কুনিতে দাঁড়িয়ে এখন আর আকাশ দেখা যায় না। দেখা যায় মাদ্রাসার বিশাল বিশাল বারান্দা। তবুও এতোকিছুর মধ্যে একজন নয়ন একজন নিধি পরম মমতায় কোন নামহীন সম্পর্কে সব সময় পাশে থাকে। এমনি প্রায়ই মধ্যরাতে রাতে ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’ গানটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে নীতু।

প্রতিদিন ঘুম ভাঙলেই কাফকার মেটামরফোসিসের কথা মনে হয় নীতুর। প্রতিনিয়ত সে যেন একটা তেলাপোকায় পরিণত হচ্ছে। নিজেকে কেমন দার্শনিক মনে হয়। জীবনে কোন কিছুই স্থায়ী না। বেঁচে থাকাটাই কেমন আশ্চর্যরকম সুন্দর। অর্থই এখানে নিয়ন্ত্রণ করে জীবনটাকে। স্কুল ছুটির দিনে ঋদ্ধ বাসায় থাকলে বলে মা অফিস থেকে আসবার সময় এটা এনো ওটা এনো। কিন্তু নীতু প্রয়োজনের যোগান্টুকু ছাড়া তেমন কিছুই কিনে দিতে পারে না। একদিন নীতু ঋদ্ধকে বলে যায় “বাবা ,মামণি তোমার জন্যে অনেক ভালোবাসা নিয়ে আসব”। এরপর থেকে নীতু বাসায় ফিরলেই ছোট্ট ঋদ্ধ মায়ের ব্যাগে ভালোবাসা খোঁজে। নীতু অবাক বিস্ময়ে ছোট্ট ছেলের এডাপটেশন দেখে মুগ্ধ হয়।

 

এই পৃথিবীতে নীতুর একান্ত আপনজন ষাটোর্ধ্ব মা আর সন্তান ঋদ্ধ। নীতুর মা নীতুর সংসার খরচের অনেকটাই নির্বাহ করে।প্রতি মুহুর্তে একটা মানসিক অস্থিরতার মধ্যে থাকে নীতু। তার মা গত এক বছর  আগে রিটায়ারমেন্টে গেলে সুপারসেন্সিটিভ হয়ে যায়। হঠাত করে একমাত্র মেয়ের জীবনের এমন পরিণতি মেনে নিতে পারে না। সমাজের কাছে বিভিন্নভাবে হেয় হতে হয় নীতুর মাকে। এক পর্যায়ে নীতুর প্যাশন ,চাকরি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে  নীতুর মা প্রত্যেকটা বিষয়ে অর্থনৈতিক সাপোর্টের বিষয়টা তুলে ধরে। মাঝেমধ্যেই রাগের বশে নীতুর দিকে টাকা ছুঁড়ে মারে। নীতু অপ্রস্তুত হয়। ছোট্ট ঋদ্ধ ভয় পায় এমনটা দেখে। স্বভাবে শান্ত হলেও নীতু কখনোই অন্যায়র সাথে আপোষ করে নি। কেমন যেন রিয়াক্টিভ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো ঋদ্ধের উপরে চড়াও হয়ে বকা দেয় গায়ে হাত তোলে। মা বকা দিলে ঋদ্ধ বলে ওঠে “আমি কিন্তু বাবার বাসায় চলে যাব”। নীতুর মধ্যে অদ্ভুত রকমের অন্তরদহন হতে থাকে। নীতুর মা শহরের নতুন বাসায় বদ্ধ পরিবেশে খুব বেশিদিন থাকতে পারে না। ঋদ্ধ দিদুনের রিচুয়ালে অভ্যস্ত হতে থাকে। কাজ থেকে বাসায় ফিরলে সারাদিনে দিদুন-ঋদ্ধের অনুযোগ অভিযোগের গল্প শোনে। ঋদ্ধ রেগে গেলে দিদুনকে মারলে দিদুন শিশুর মত কাঁদতে থাকে। এসব শুনে নীতুর খুব অসহায় লাগতে থাকে। মাঝেমধ্যে মনে হয় ঋদ্ধকে ডে-কেয়ারে রাখবে কিন্তু সেখানেও তো অনেক খরচ আর নার্সিং কতটা ভালো হবে বা সন্ধ্যার পর কে দেখে রাখবে এসব ভেবে আর ডে-কেয়ারে দেয়া হয় না। মায়ের পরিবর্তে নীতুর এক কাজিন ঋদ্ধের দেখাশোনা করে।

জীবন গল্পের চলছবিতে নীতুর সাথে মায়ের বেশ মানসিক দুরত্ব। নীতুর বাবা মারা যাবার পর মা নিজেও একরকম সংগ্রাম করেই নীতুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছে। কিন্তু নীতু ঠিক আর পাঁচটা মেয়ের মতোন টিপিক্যাল নয়। এই ভাবনাগুলোই মায়ের সাথে সমাজের সাথে বিরোধ তৈরি করেছে অসংখ্যবার। একজন হিন্দু মেয়ে হয়ে মুসলিম একজন ছেলেকে বিয়ে করা ,ডিভোর্স দেয়া কিংবা ছোট্ট ঋদ্ধকে হিউম্যানিস্ট করে তোলার আকাঙ্ক্ষা এসবকিছুই তথাকথিত সমাজের বিপক্ষে  দাঁড় করায় নীতুকে। এমনকি নতুন করে কোন পুরুষকে ভালোবাসবার ইচ্ছেটার মাঝেও শত শত প্রশ্নেরা এসে ভীড় করে তার একান্ত সংগোপনে।

ছোট্ট ঋদ্ধ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায় তার নতুন বাসায়। মাঝেমধ্যে মায়ের কাছে বায়না করলেও সে এখন বুঝতে পারে বাবা নতুন বাসায় আর আসবে না। কখনো মামণিকে আদর করে জড়িয়ে ধরে খুব আহ্লাদে নীতুকে বলে বাবা তোমাকে মেরেছিল। নীতু এড়িয়ে যায়। নীতু সব সময় বাবার পক্ষে একটা পজিটিভ এটমোস্ফিয়ার গড়ে তুলতে চায়। বাসায় ঋদ্ধের জন্য আলাদা একটা ফোন থাকে বাবার সাথে প্রায়শই ভিডিও কলে কথা বলে ঋদ্ধ। ঋদ্ধ জানে তার বাবা শুটিং করে। বাবা সিনেমাটোগ্রাফার। বাবার অফ ডে তে ঋদ্ধ তার বাবার বাসায় যায়। দিনভর থেকে রাতে নতুন বাসায় মায়ের কাছে ফিরে আসে। ছোট্ট ঋদ্ধের মনে একদিন প্রশ্ন জাগে “আচ্ছা মা সন্ধ্যাবেলায় আল্লাহ দিলে দিদুন কেন বাতি দেয় আর দাদান তো আল্লাহ দিলে নামায পড়ে কেন?” ঋদ্ধের এ প্রশ্নে নীতু ভীষণরকম অবাক হয়। নীতু ঋদ্ধকে বলে সন্ধ্যাবাতি দেয়া দিদুনের রিচুয়াল আর নামায পড়া দাদানের রিচুয়াল। নীতুর স্মৃতিতে ভেসে আসে এ সমাজের মোল্লা পণ্ডিত ঋদ্ধের মুখে ভাত কিংবা আকিকার মতো কোন রিচুয়াল করতে দেয় নি। আরো মনে হয় কদিন পরই ‘মুসলমানি দেয়া’র মতো একটা রিচুয়ালের বিরুদ্ধে তাকে দাঁড়াতে হবে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান –আদিবাসী সব সংস্কৃতির উৎসবের অংশীদার হয়ে হয়ে ঋদ্ধ একদিন আপনার ধর্মকে খুঁজে নেবে।

বাবা-মায়ের কো-প্যারেন্টিং এ বেড়ে উঠতে থাকে ঋদ্ধ। ঘরের দেয়ালজুড়ে তার ক্যানভাস তৈরি করতে থাকে রঙপেন্সিল রংতুলি দিয়ে । ভাড়া বাসার দেয়ালে রঙ করবার স্বাধীনতাটুকু না থাকলেও নীতু তাকে বাধা দেয় না। এক বছর আগেও নীতু ভাবে নি এই ছোট্ট শিশুটাকে এতো বড় নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। মনে ভাবে “সত্য বড় কঠিন ,কঠিনেরে লও সহজে”। এভাবেই নীতু থেকে নীতুরা বাস্তবতার কষাঘাতে ছুটতে থাকে পরিবারের-সমাজের- রাষ্ট্রের অদৃশ্য শৃংখলের বলয়ের মধ্যে।











Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *