follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

কবি সুফিয়া কামালের চিকিৎসক হয়ে ওঠার গল্প

সুফিয়া কামাল তার এক জীবনে শুধু কবিতাই লেখেননি, কতরকম ভাবে যে কত মানুষকে দিয়ে গেছেন অনুপ্রেরনা আর সমৃদ্ধ করেছেন সমাজকে তার বিশ্লেষন এই ছোট্ট লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব না।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/07/Sufia-Kamal-with-her-husband-Kamaluddin-Ahmen_1939.jpg

‘নারীমুক্তি মানেই মানবমুক্তি’ এই কথা ছিল বেগম সুফিয়া কামাল এর  জীবনযাত্রার অন্যতম বিশ্বাস। সেজন্যেই তাকে বাঙালি নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম একজন পথিকৃত বলা হয়। আজীবন সংগ্রামী এই মহীয়সী নারী বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতিশীল সংগ্রামসহ শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে যে ভূমিকা রেখে গেছেন তার সুফল এখনো এই দেশের তরুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে আছে। 

সুফিয়া কামাল তার এক জীবনে শুধু কবিতাই লেখেননি, কতরকম ভাবে যে কত মানুষকে দিয়ে গেছেন অনুপ্রেরনা আর সমৃদ্ধ করেছেন সমাজকে তার বিশ্লেষন এই ছোট্ট লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব না। তিনি যে ভেষজ চিকিৎসায়ও পারদর্শী ছিলেন সেটা কিন্তু আমাদের অনেকেরই অজানা। তার কন্যাদ্বয় সুলতানা কামাল (লুলু) আর সাঈদা কামাল (টুলু) এর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় আমাদের কাছে উঠে আসে সেই তথ্য। 

বাড়ীটির নাম সাঁঝের মায়া।গাছ-ফুল-ফল-লতায়-পাতায় ছাওয়া লাল ইটের গাঁথুনি দেয়া দালান। ঢুকতেই একটা কুকুর খুউব তীক্ষ্ণভাবে তাকালো। অতঃপর দোতলায় সুফিয়া কামালের কন্যা টুলু আপার সাথে সাক্ষাৎ। জানতে পারলাম আদুরে কুকুরটির নাম কুটুস।

টুলু আপাই শুরু করলেন এভাবে, ‘ছোটবেলায় তো জলাতংকের টীকা প্রচলিত ছিল না। কুকুর কামড়ালে মা প্রতি শনি-মঙ্গলবারে গুড় পড়ে দিতেন। তাতেই কুকুর কামড়ানোর রোগী ভালো হয়ে যেত। ছোটবেলায় হাতে ফোস্কা পড়ে গেলে মা আমাদের দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন দেখেছি ফোস্কা মিলিয়ে যেত। এমনকি হাঁপানি রোগের ওষুধ ও জানতেন তিনি’। 

টুলু আপার সাথে কথা প্রসঙ্গে আরো জানতে পারি, বরিশালের  শায়েস্তাবাদে নবাব বাড়ির মেয়ে হাসুবানু ছোটবেলায় একবার হারিয়ে গিয়েছিলেন। সবাই বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে যান এতে। তারপর তিনি ফিরে জানিয়েছিলেন শাদা দাড়িওয়ালা শাদা পোশাকের একজন মানুষ তাকে পথ চিনিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছেন। এই ‘হাসুবানু’ নামটা ছিল সুফিয়া কামালের ভাইয়ের দেয়া নাম। এমনকি সুফিয়া কামালের নামাজের জন্য যে জলচকি ছিল তাতে জ্বীন থাকতো তাই তার জলচকিতে অন্য কেউ নামাজ পড়তে পারতো না কারণ অন্য কেউ নামাজ পড়লে সেই জ্বীন তাকে খুব বিরক্ত করতো। আরও জানা যায়, সুফিয়া কামাল আগে থেকেই অনেক কিছু বুঝতে পারতেন। তার মনে শংকা হলে তি্নি কোথাও যেতে বারণ করতেন। তার নিষেধ অমান্য করলে এমন কিছু ঘটত যা তার জন্য কল্যাণকর নয়। এমনই খণ্ড খণ্ড চিত্রগুলো  কেমন গল্পের মতোন বলে যান টুলু আপা। এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় সুফিয়া কামালের ভেতরে এমন এক অন্য বিশ্বাস ছিল, ভিষন অতিপ্রাকৃত সাহস আর শক্তি ছিল। 

ভীষণ উচ্ছ্বলতায় কথা বলতে বলতে সুলতানা আপা ফিরে যান ছোটবেলায়।‘ প্রতি শনি আর মঙ্গলবার সুর্যোদয়ের আগে ভোরবেলা  থেকেই লোকজন আসতে শুরু করতো বাড়িতে। এখন তো গেইট আছে তখন তো গেইট ছিল না। ছিল খালি পেটে পাঁচ সিকার দারুচিনি (পরবর্তীতে একুশ টাকার সমান) ছোট ছোট তিন টুকরা করে সকাল বেলায় খালি পেটে দুপুরে আর রাতে তিনবেলায় খেতে বলতেন মা, যেটা ছিল হাঁপানির ওষুধ। এটার পেছনে একটা গল্প রয়েছে। আমি জন্মেছি মাত্র মা তখন আঁতুড়ঘরে আমাকে নিয়ে অসুস্থ। হঠাত জেগে দেখেন বাবা জানালার শিক ধরে শ্বাসকষ্টে ছটফট করছেন। মা খুউব কষ্ট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছেন যে তিনি বাবার জন্য কিছুই করতে পারছেন না। ঘুমের মধ্যেই তিনি স্বপ্নে দেখেন কেউ একজন বলছেন এই দোয়া পড়ে এই দারুচিনি টা খাইয়ে দেবে। এরপর থেকে বাবার হাঁপানি ভালো হয়ে যায় এমনটাই জানান তিনি।  দারুচিনি  ছিল বড়দের জন্য আর ছোটদের জন্য মধু। এই ওষুধে বাবা সুস্থ হয়ে ওঠে’। এভাবেই শুরু হয় সুফিয়া কামালের এক অন্য চিকিৎসক জীবন। যা আমাদের অনেকেরই অজানা থেকে গেছে। 

সুলতানা আপা আরো বলে যান, মা যেটা নিশ্চিত করে বলতেন কারোর এঁটো খাওয়া যাবে না। রোগীর বাসন-গ্লাস-চায়ের পেয়ালা এগুলো কারোও টা কেউ ব্যবহার করা যাবে না। দোয়া পড়ে ফু দিতে ক্লান্ত হলেও মানসিককভাবে ক্লান্ত হন নি তিনি। তিনি জানান ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানমনষ্কতায় বেড়ে উঠেছেন। এগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়তো নেই কিন্তু দ্রব্যের ভেষজগুণ আর নিয়মানুবর্তিতা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়ক এমনটাই উল্লেখ করেন তিনি। সবচাইতে সূক্ষ্ম বিষয়টি হলো ‘’মা সবকিছু এতো বিশ্বাসের সাথে আন্তরিকতার সাথে করতেন যেটার প্রভাব পড়তো মানুষের উপরে’’। আমরা সকলেই জানি সমাজের নারী জাগরণের জন্য সুফিয়া কামালের একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব তো ছিলো এমনিতেই। সুফিয়া কামাল যে আগে থেকেই অনেক কিছু আঁচ  করতে পারতেন তার একটা বড় দৃষ্টান্ত ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ, আগের দিন ভীষণ অস্থিরতার জানান দিয়েছিল তার মনে। 

সুফিয়া কামাল ছিলেন ভীষণ শান্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। কাজকে কখনো ভয় পেতেন না। কোন কাজ ফেলে রাখতেন না। ভীষণ অসুস্থ হলেও কখনো কাউকে বিরক্ত করতেন না। শুধু কবিতা লেখা মিছিল মিটিং নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না একই সাথে সংসারের কাজ করতেন সিদ্ধহস্তে। যেটাকে সুলতানা আপা বলেছেন ‘unassuming’। পোষা কুকুর-বিড়ালের সেবা শ্রুশুষাও করতেন সুফিয়া কামাল। এরই মধ্যে  টুলু আপা বলেন তাদের ভাইরা রাস্তা থেকে অসুস্থ কুকুর বিড়াল তুলে আনলে হলুদ গরম করে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিতেন। খুব মজার স্মৃতিচারণ করে সুলতানা আপা জানান, আব্দুল নামে ঘরের কাজে সাহায্যকারী একজন ছিলেন যিনি একদিন বিরক্ত হয়েই বলেছেন “এইটা হলো কুত্তাদের মেডিক্যাল।“ 

কাজের নাম কর। প্রতিবাদ করতে হলে রাস্তায় দাঁড়াও। বলতে হলে  বলো। কাজকে ফেলে রাখতে নেই। কাজকে ভয় পেও না। সেবা করে যাও। এই ছিল সুফিয়া কামালের মূলমন্ত্র। ফেমিনিস্টরা এক সময় বলতেন,  ’Personal is political’’পাবলিক –প্রাইভেট পারসোনার কোন ডিকোটামি ছিল না ওনার মধ্যে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামাজিক  জীবনে একই রকম ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। জীবনের আদর্শ,সৃষ্টিশীল কাজ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা সুফিয়া কামাল কে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। শুভ জন্মদিন জননী সাহসিকা।  

 

  



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *