follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

শিশু প্রতিপালনের আদ্যোপান্ত

জেনেটিক্সের প্রভাবে ভ্রূণ থেকে শরীর তৈরি হয় আর জন্মের পর তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে একটু একটু করে শিশু শিখতে শুরু করে তার আচরণ।একটা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাবা –মা ,তার পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকতা।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/07/martha-dominguez-de-gouveia-jdFAWaAgT6w-unsplash-1280x850.jpg

শিশুকে প্রতিপালন করবার প্রাথমিক ধাপ শুরু হয় প্রেগনেন্সি পিরিয়ড থেকেই।  একজন অন্তঃস্বত্বা নারী স্রষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সন্তানের আদল তৈরি হয় মায়ের গর্ভ থেকেই। প্রত্যেক মা তার গর্ভে লালিত সন্তানকে নিয়ে নানারকম স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে। কথায় বলে মা যেমনটা চাইবে, ভাববে, যেমন কাজ করবে তেমনভাবেই মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠবে তার সন্তান। জেনেটিক্সের  প্রভাবে ভ্রূণ থেকে শরীর তৈরি হয় আর জন্মের পর তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে একটু একটু করে শিশু শিখতে শুরু করে তার আচরণ।    

একটা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাবা –মা ,তার পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকতা। শিশু জন্মের ছমাসের মধ্যেই হামাগুড়ি দিতে শুরু করে ,ধীরে ধীরে আধো আধো কথা বলতে চেষ্টা করে। শব্দ-আলো-তাপমাত্রা এমনকি নিজের থাকবার ঘরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে। আট মাস বয়স থেকে এক বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে দাঁত ওঠে প্রাকৃতিক নিয়মেই নিজের পায়ে ভর দিয়ে শিশু হাঁটতে শুরু করে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিরলসভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে একজন মা। একক পরিবারে থাকা একজন কর্মজীবী নারী ছয়মাসের বেশি সন্তানের সাথে পুরোপুরি সময় কাটাতে পারেন না। সেক্ষেত্রে নিজের স্বামীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে শিশুকে ডে-কেয়ারে  রাখবার মতো সিদ্ধান্তও তাকে নিতে হয়।  

এ সমাজের প্রেক্ষিতে খুব প্ল্যান করে কোন নারী সন্তান ধারণ করবে কিংবা সন্তান ভূমিষ্ট হবে খুব অনুকুল পরিবেশে তেমনটা খুব সচরাচর ঘটে না। একজন নারী সব সময় চায় সন্তান ধারণ করবার পর থেকে তার প্রতিটি মুহূর্ত খুব আনন্দে কাটবে। কিন্তু তা হয়ে ওঠে না অনেকাংশেই  হোক সে কর্মজীবী নারী হোক কিংবা হাউজ ওয়াইফ।

শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের স্বার্থে খুব ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নেয়াটা জরুরী। শিশু কি করতে পছন্দ করছে ,কি বলছে কতটা  রেসপন্স করছে, কতটা রিয়াক্ট করছে এসব বিষয়ে মা বাবা সহ পরিবারের সকলকেই খেয়াল রাখতে হয় যদিও মায়েদের উপর দায়িত্বটা বেশি বর্তায়।

শিশু মাত্রই অনুকরণপ্রিয়। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা খুব প্রখর থাকে। এ সময়ের মধ্যে একটা শিশু যখন নূন্যতম বোধে বুঝতে শুরু করে তার সামনে যা ঘটে তাই সে অনুকরণ করবার চেষ্টা করে। যদি ছোট্ট শিশুকে প্রতিদিন একবার করেও বলি “তোমাকে খুব ভালোবাসি”তাহলে শিশুর মধ্যে কনফিডেন্স তৈরি হয়। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলে তার মধ্যে মায়ের উপর নির্ভরতা বাড়ে। কিছু কমন প্রবণতা দেখা যায় আমরা আদরের আতিশায্যে এমন অনেক আচরণ করে বসি যেটা করা মোটেও উচিত নয়।  

  • স্পষ্ট করে কথা বলা ঃশিশুরা যে আধো স্বরে কথা বলে তা ওদের স্বভাবজাত মেকি নয়। কিন্তু আমরা প্রায়ই শিশুদের সাথে বাচ্চা টোনে কথা বলি। একটা সময় শিশুও ওই টোনেই অভ্যস্ত হয়ে যায় যা বড় হয়ে কাটাতে পারে না।

 

  • শেয়ার করে খেলা ঃ  পাশের প্রতিবেশী কিংবা স্কুলের বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে প্রায়ই শিশুরা নিজের খেলনা বা নিজের জিনিস নিয়ে সচেতন থাকে। সেক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে এটা অন্তত একবার হলেও বুঝিয়ে বলতে হয় শেয়ার করে খেলতে হয়। তার মধ্যে ধীরে ধীরে একটা বোধ তৈরি হতে থাকবে। 

 

  • সব শিশুকেই ভালোবাসতে হয় ঃ শিশুরা আপন জগতে আপনি রাজা। যেটা নিজের সেটা খুব ভালো করে বোঝে যেমনটা বোঝে মায়ের শরীরের স্পর্শ এমনকি মায়ের আদরের ভাগ অন্য কোন শিশুকে দিতে দেখলেই প্রচণ্ড অভিমান হয় তার। বড়দের উচিত শিশুদের  সাথে কথা বলে এই প্র্যাক্টিসটা করা যে সব শিশুকেই ভালোবাসতে হয়,আদর করতে হয়।
  • নিজের হাতে খাও ঃ  মায়েরা অতিরিক্ত ভালোবাসা বা কেয়ারনেসের জন্য কিংবা পরিবারের শুশুর শাশুড়ির কথা শুনতে গিয়ে সন্তানকে তার  নিজের হাতে খেতে দিতে চান না। এক্ষত্রে কিন্তু সন্তানের সেলফ ডেভ্লপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়। নিজের কনফিডেন্ট হারিয়ে ফেলে এবং মায়ের উপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ে। 
  • কাউকে মারবে না  ঃ পরিবারের কেউ যদি রাগবশত অন্য কারো উপর চড়াও হয় গায়ে হাত তোলে লাথি দেয় কিংবা গালিগালাজ করে তাহলে শিশুটিও ধীরে ধীরে সেসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যেটা খুবই ভয়ানক অভ্যাস কারণ শিশুর নাজুক মনে এসব গেথে গেলে তা সহজেই দূর করা যায় না বরং তাকে বোঝাতে হবে কাউকে মারতে নেই কিংবা এসব খারাপ কথা বলতে নেই। 
  • দূর থেকে টেলিভিশন দেখা ঃ  প্রযুক্তির কারণে শিশুরা সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নাগরিক জীবনে একক পরিবারের শিশুরা অনায়াসেই ইউ টিউব কার্টুনে অভ্যস্ত যেটা শিশুর কল্পনাশক্তিতে নষ্ট করে দিচ্ছে। শিশু একটু কাঁদছে বা খাচ্ছে না বা ঘুমোচ্ছে না  “চলো কার্টুন দেখি” তে অভ্যস্ত করে ফেলছি প্রতিনিয়ত যেটা তার বুদ্ধি বিকাশ বাধাগ্রস্ত তো হচ্ছেই সাথে সাথে চোখের উপর ল্যাপটপ মোবাইল স্ক্রিনের রে-গুলো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। একজন শিশুর অভিভাবকককে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে এ বিষয়ে। ডক্টর সাজেশন অনুযায়ী শিশুকে প্রতিদিন শুধুমাত্র আধাঘন্টা মেক্সিমাম দুরত্বে টিভি দেখতে দিতে দেয়া যেতে পারে।
  • পারমিশন নিয়ে ব্যাগে হাত দেওয়া ঃ মা  অফিস থেকে ফিরল কিংবা বাবা। নিজের সন্তান মায়ের ব্যাগ খুলে পসরা সজিয়ে বসল কিংবা বাবার মানিব্যাগটা খুলে টাকা বের করে খেলতে থাকল। একটা সময় আপনার বা আমার চোখের  আড়ালে যখন প্রয়োজনীয় কিছু ছিড়ে ফেলল বা হারিয়ে ফেলল তখন হয়ত আপনি বা আমি বুঝব এর গুরুত্ব। এগুলো খুব স্বাভাবিক মনে করে এড়িয়ে যাই একজন শিশুর স্কুলিং এর জন্য অবশ্যই তাকে এটা বুঝিয়ে বলা উচিত এটা মা কিংবা বাবার ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিস তাহলে শিশুর মধ্যেও ব্যক্তিত্ববোধ একটু একটু করে তৈরি হবে। 

একজন শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত একথা সচরাচর বলে থাকি। ছেলে কিংবা মেয়ে শিশু যাই হোক না কেন কোন ধরণের বৈষম্যমূলক আচরণ তার সাথে করা উচিত নয়। এমনকি ধর্মীয় শিক্ষা দেবার ক্ষেত্রেও অন্য ধর্মের প্রতি  নেতিবাচক শিক্ষা দেয়া একবারেই নীচু মানসিকতার পরিচায়ক। কোমলমতি শিশুর কাঁধে রাশি রাশি বইয়ের বোঝা না চাপিয়ে খুব সরলভাবে তার শৈশব গড়ে উঠবার পরিবেশ গড়ে তু্লবার দায়িত্ব আমাদের। নাগরিক জীবন বৃত্তের বাইরে প্রকৃতির নদী-জল-ফুল-ফল-মাটির গন্ধ নিতে শিখুক প্রতিটি শিশু। ছেলে বা মেয়ে নয় আপন বোধে মানুষ হয়ে উঠুক প্রত্যেক শিশু – এ দায়িত্ব আমাদের।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *