follow us at instagram
Wednesday, February 19, 2020

ডিভোর্স বাড়ছে, সংসার ভাঙছে

পুরুষ নারীকে সবসময় তার করায়ত্ব করে রাখতেই চেয়েছে স্বাধীনতা দিতে চায়নি কখনো। তবুও এখন সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে তাই নারীরাও ডিভোর্সের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় না।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/07/sample-2.jpg

ইদানিং কালে ডিভোর্স শব্দটা বেশ মুখরোচক। পরিচিত কেউ কাউকে ডিভোর্স দিয়েছে বা ডিভোর্স দিতে যাচ্ছে, প্রায়ই এমনটা শোনা যায়। কিন্তু আমরা কী কখনো এর কারণ জানবার চেষ্টাটুকু করেছি। স্বামী-স্ত্রীর হৃদ্যতার সম্পর্ক একটা সময় তিক্ততায় পরিণত হয়। সেটাতো খুব সহজাত নয়। সেদিনই কিছু ডিভোর্সি নারীদের নিয়ে সেলফ কনফিডেন্স বিল্ডিংয়ের একটা ওয়ার্কশপ হলো। আমি নিজেও ছিলাম সেখানে। কয়েকজনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবার সুযোগ হলো।

গেল কয়েক বছরে ডিভোর্সের হার বেড়েছে অনেক গুণ বেশি।

নিধি গোমেজের কথা দিয়েই শুরু করছি। নিধি মাস্টার্স কমপ্লিট করেই জয়েন করে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে। খুউব ভালো ভারতনট্যম নাচে সে। অফিস জয়নিং এর এক বছরের মাথায় তারই এক অফিস কলিগ সিদ্ধার্থকে বিয়ে করে। অফিস কলিগ ছিল হিন্দু। নিধির শ্বশুর শাশুড়ি তাকে তো তো মেনে নেবার প্রশ্নই আসে না। আর সেখান থেকেই মূল ক্রাইসিসের শুরু। একসাথে চলতে গিয়ে দুজন দুজনের রিচুয়াল পালন করলেও সিদ্ধার্থ নিজের মায়ের আদল খুঁজতে থাকে নিধির মধ্যে। নিধি  একেবারেই সংসারি গোছের নয়। কেয়ারিং কিন্তু নিধি নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করে হাজব্যান্ডের খাবার প্লেট ধোয়া বা কাপড় ধুয়ে আয়রন করে রাখা কিংবা সিদ্ধার্থর খাবার প্লেট ধোয়া বা জুতা পরিস্কার করে রাখা টাইপ নয়। সিদ্ধার্থ ও  নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করে। সিদ্ধার্থ গান গায় খুউব ভালো। দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তন নিয়ে ভাবে সিদ্ধার্থ মানে সে বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত। কিন্তু বাধ সাধে খুউব সেন্সিটিভ ইস্যু। হঠাত করেই নিধি ফিজিক্যাল রিলেশনে অনাগ্রহ দেখায়। সিদ্ধার্থ বেশ অবাক হয়। সিদ্ধার্থর তার গহীনের কথা কারও সাথে শেয়ার করতে পারে না। নিধির সাথে পরিচয় হবার আগে ক্যাম্পাস লাইফের প্রথম প্রেমিকাকে কখনোই ভুলতে পারেনি সিদ্ধার্থ। প্রচন্ড রকম ভালোবাসত সে সেই মেয়েকে। প্রায়ই তার মধ্যেএক ধরণের ডুয়েলিটি কাজ করত। একদিন ঘুমের ঘোরে যখন স্বপ্ন দোষ হয় তখন তার নাম ধরে ডাকতে থাকে সিদ্ধার্থ যেটা শুনে ফেলে নিধি। এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতে থাকে দুজনের মধ্যে যেটা সিদ্ধার্থ মেনে নিতে পারে না। দুজন পরিবার ফেলে এসে বিয়ে করেছে এটাই উঠে আসে বারবার। সিদ্ধার্থ অতীতকে ভুলে নতুন করেই নিধিকে গ্রহণ করতে চেয়েছে সম্পূর্ণভাবে পারেনি। এমন কি নিধির সাথে পরিচয়ের পর সেই মেয়ের সাথে সিদ্ধার্থ কখনো যোগাযোগও করেনি। তবুও এই ভুল বোঝাবুঝিতে এমনি করে নিধি আর সিদ্ধার্থর মধ্যে দুরত্ব তৈরি কথাবার্তা হয় না। এর পর বেশ কয়েকমাস গড়িয়ে যায়। নিধি হঠাত অফিস থেকে ফিরেই ডিভোর্স পেপার ধরিয়ে দেয় সিদ্ধার্থকে এবং বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলে এবং অকথ্য গালিগালাজ করে। সিদ্ধার্থও ডিভোর্স পেপারে সাইন করে এক কাপড়ে বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। সিদ্ধার্থ ভেবেছিল সময় গড়ালে নিধি হয়তো ফিরবে কিন্তু অনেক অনুরোধ ক্ষমা চাইবার পরেও আর নিধি ফেরেনি। এ দুজনের গল্পটা ছিল একেবারেই অন্যরকম।

আমরা অধুনা সমাজে বাস করলেও বড় একটা অংশ এখনো আমরা এখনো মনে প্রাণে ততোটাই সনাতন।

মনে করা হয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করলে সেটার স্থায়ী হয়। কিন্তু আদতেই কী তাই? হ্যা সেটাতে পরিবারের সদস্যদের একটা সহযোগিতা হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে নিজেদের পারস্পরিক বোঝাবুঝির ভিত্তিতে। খুউব সাম্প্রতিক সময়ে ডিভোর্সের পরিমাণ বেড়ে গেছে অনেক গুণ। একটা সাধারণ সমীক্ষায় জানা যায়, এনড্রয়েড ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সংখ্যা অনেক বেশি। ইন্টারনেটের বিভিন্ন অ্যাপ যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, টিন্ডার, মেসেঞ্জার, ইমো এগুলো ব্যবহার করবার ফলে স্বামী- স্ত্রীরা পরকীয়া প্রেমে ঝুঁকছে অনেক ক্ষেত্রেই। প্রতারিত হচ্ছে অপরিচিতদের কাছ থেকে। ফলাফল সংসারে ভাঙন ধরছে। যারা হাউজ ওয়াইফ কিন্তু সারাদিন বাসায় একঘেয়ে জীবনাচরণে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের এক অংশের মধ্যে একটা প্রবণতা কাজ করছে অ্যাপ এফেকশন অপরিচিত পুরুষদের সাথে টাইম স্পেণ্ডিং- চ্যাটিং-ফ্ল্যাটারিং । আবার অফিস গোয়িং পুরুষরাও স্ত্রীর অবর্তমানে অপরিচিত মেয়েদের সাথে ফ্ল্যাটারিং থেকে শুরু করে সেক্স চ্যাটিং পর্যন্ত করছে যেটা পারস্পরিক দাম্পত্য জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস-ঝগড়া বিবাদ-ফিজিক্যাল টর্চার-মেন্টাল টর্চার। অতপর পরিণতি ডিভোর্স।

সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ সেপারেশনের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে । আমাদের সমাজে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ফিজিকাল রিলেশনের যন্ত্র মাত্র। অনেক নারীরা ফিজিক্যাল রিলেশন নিয়ে ততোটা পারদর্শী নয়। অনেক নারীই ‘অ্যানাল সেক্স’ করতে ভয় পান। আবার পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রেই সেক্স ফ্রিক। ইন্টারনেটে পর্ণো মুভি দেখে অনেকে পুরুষ সেটা নিজের স্ত্রীর সাথে এপ্লাই করতে চান । এভাবে দাম্পত্য সম্পর্কে  অনেক নারীই প্রতিনিয়ত এবিউজড হচ্ছে। যেটার কারণে পুরুষ অনেক সময় পতিতালয়ের মুখাপেক্ষীও হচ্ছেন। একটা সময় বাধ্য হয়ে স্ত্রী তার হাজব্যাণ্ডকে ডিভোর্স দিচ্ছেন।

দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর রাখতে একই ভাবে দাম্পত্য সম্পর্ক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বামী-স্ত্রীর দুটো পরিবারে অন্যান্য সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে নারীরা কর্মমুখী হওয়ায় ব্যক্তিত্ববোধ বাড়ছে এজন্য ডিভোর্স বাড়ছে । কিন্তু এ ধারণা মোটেও ঠিক নয় বরং বিষয়টা পজিটিভ। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ব্যক্তিগত সমঝোতা যখন একবারেই সম্ভব হয় না তখনই সেপারেশনে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় স্বামী বা স্ত্রীর যেকোন এক পক্ষ বা দুপক্ষই। মুসলিম বিয়েতে ডিভোর্স প্রসিডিউর যতোটা সহজ ততোটা হিন্দু আইনে সহজ  নয়। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট তো নয় ই। একজন নারী বা পুরুষকে ডিভোর্স দিতে চাইলে কিছু আইনী প্রসিডিউরের মধ্যে দিয়ে এগুতে হয়। পুরুষশাষিত সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ নারীকে সবসময় তার করায়ত্ব করে রাখতেই চেয়েছে স্বাধীনতা দিতে চায়নি কখনো। মধ্যযুগীয় এ চিন্তা এখনো বর্তমান তবুও এখন আইনী সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে নারীদের মধ্যেও যে কারণে ডিভোর্সের মতো সিদ্ধান্ত নিতে এখন নারীরাও পিছপা হয় না।

একজন নারী বা পুরুষের বৈবাহিক জীবনে কখনোই ডিভোর্স বা সেপারেশন কাম্য নয়।

কিন্তু যখন দুজনের মধ্যে মানসিক দুরত্ব বেড়ে যায়, অবিশ্বাস তৈরি হয় ,দুজন দুজনের উপর পারস্পরিক শ্রদ্ধা নির্ভরতা হারিয়ে ফেলে কিংবা অপমানিত হয় প্রতিনিয়ত, যে কোন পক্ষ মানসিক ভাবে শারীরিক নির্যাতিত হয় , তখনই ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়। একটা তিক্ত সম্পর্কে আবব্ধ না থেকে তখন ডিভোর্স দেয়াটাই শ্রেয় এতে অসম্মানের কিছু নেই। কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় যদি ভুল বোঝবুঝি দূর করে একটি সম্পর্ককে বাঁচিয়ে বেঁচে থাকা যায় ভালোভাবে তাহলে মন্দ কি? তাই সময় নিয়ে বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারন জীবন একটাই। কোন একটি ভুলে তা যেন জীবনকে এলোমেলো করে না দেয়।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *