follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

মাসের খরচ শেষে সংসারের সঞ্চয় কতখানি?

একটু হিসেব করে নিজের খরচের তালিকা করে গুছিয়ে নিলে সামলানো যায় সহজে। আর জমাও হয় একটু করে যা সংসারের জন্যে নিতান্তই অপরিহার্য। 
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/08/Capture.PNG-22.png

একটা পরিবারের ফিন্যান্স মেইনটেন্যান্স কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। হোক সে হাউজ ওয়াইফ কিংবা চাকুরীজীবী। মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শুরু হয় এই বিল তো সেই বিল পরিশোধের চাপ। বাসা ভাড়া, সার্ভিস চার্জ ,গ্যারেজ ভাড়া, পানির বিল, গ্যাস বিল, ইন্টারনেট বিল, ডিশ বিল, বুয়ার বেতন, ময়লার বিল তো ধরাবাঁধা। তারপর মাসের বাজার তো আছেই। পরিবারের সকল সদস্যদের একটা নির্দিষ্ট বাজেট রাখা  উচিত বিশেষত পরিবারের বয়স্ক বাবা মা বা সন্তান থাকলেতো অবশ্যই। সন্তান স্কুলগোয়িং হলে তার স্কুলের বেতন কিংবা স্টেশনারিজ যেমন খাতা –কলম-পেন্সিল তো লাগেই প্রত্যেক মাসে। প্রত্যেক মাসে চিকিৎসার জন্য আলাদা একটা খরচ রাখতেই হয়।

হাউজওয়াইফ থেকে চাকুরীজীবী সকলেই এতোসব খরচের মাঝে ব্যাংকে সেভিংস রাখবারও চেষ্টা করেন।

একটা ফ্যামিলিতে তিনবেলার রান্নার মধ্যে কিন্তু একটা ভারসাম্য রাখতে হয়। এখান থেকেই ফিন্যান্স মেইন্টেন্যান্সের প্রথম ধাপ শুরু বলে আমি মনে করি। এরপর একটু যদি ভাবি যেখানে হেঁটে গেলেই কাজটা হচ্ছে সেখানে রিক্সায় না গিয়ে হেঁটে গেলে রিক্সা ভাড়া বেঁচে যায়। অযথাই পানির ট্যাপ ছেড়ে রেখে কিংবা লাইট-ফ্যান চালিয়ে রাখলে কিংবা গ্যাস জ্বালিয়ে রাখলে যে মাস শেষে খরচটা বেড়ে যায় কজন ভাবি?

কদিন আগেই আমার বন্ধু ফারজানার সাথে কথা হলো। ও রিসেন্টলি সেপারেটেড। ফারজানার পরিবারে ওর ছোট্ট দুইটা টুইন মেয়ে, ওর বাবা আর গ্রামের বাড়ির একজন কাজিন থাকে। বাবা রিটায়ারমেন্টে গেছে একবছর। ফারজানা মিনাবাজারে জব করছে। যা বেতন পায় তা দিয়ে গড়পরতায় মাসের খরচ চলে যায়। ওর বাবা প্রতিমাসে পেনসন থেকে এককালীন যে টাকাটা পায় সেখান থেকে মেয়েকে কিছুটা ইকোনোমিকালি সাপোর্ট করে। ফারজানার এক্স হাজব্যাণ্ড তাদের সন্তানদের জন্য খরচ হিসেবে একটা এমাউণ্ট পাঠায়। প্রতিমাসের পুরো খরচটাই ফারজানা নিজ হাতে করে। বাসা ভাড়া থেকে বাজার কিংবা ওষুধপত্র কাপড় চোপড় কিংবা ছুটির দিনে বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বা বাসায় অতিথিদের খরচ সবটাই একাই মেইন্টেইন করে। এমনকি বাসায় কোন বেলায় কি রান্না হবে এটাও ঠিক করে দেয়। খুব দক্ষ না হলে এতোটা করা সম্ভব নয়।

এবার আমার কথাই বলি। আমি নিজেও সিঙ্গেল মাদার। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন তৃতীয় গ্রেডের সরকারী চাকুরীজীবী। বাবা খরচ করতো প্রচুর। সঞ্চয় বলতে কিছুই ছিলনা। বাবা মারা গেছেন আঠারো বছর। মা একাই জব করে সবটা খরচ চালিয়েছে। একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করেছি ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমার মা কখনোই তিনবেলায় মাছ-মাংস খাবার মেন্যুতে রাখতেন না। তবে প্রয়োজনীয় কিছুই সংসারে অপূর্ণ রাখেননি। তখন বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝি একজন তৃতীয় গ্রেডের সরকারী চাকুরীজীবী হয়ে কিভাবে এতোটা দেখভাল করেছেন একা। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ থেকে সবসময় একটা সামান্য অংশ ব্যাংকে রাখতেন প্রত্যেক মাসে। কখনো তাকে নিজের পছন্দে দামী শাড়ি কিনতে দেখিনি, দামী প্রসাধনী ব্যবহার করতে দেখিনি। আমি একমাত্র মেয়ে হলেও “এটা চাই ওটা চাই” এমনটা শিখিনি। এখন উপলব্ধি করতে পারি এই স্কুলিংটা কত ভালো হয়েছে আমার জন্য। বড় হতে হতে দেখেছি যেটা চাই সেটা অনেক দাম হলে এড়িয়ে যেত মা। যতোটা আয় সেটা বুঝেই খরচটা করতেহয়। যেখানে রিক্সায় যাওয়ার পথ সেখানে পায়ে হেটে যেত মা। এখনো আমার বাসায় ‘’এই যে লাইটটা জ্বলতেছে’’ এই যে ফ্যানটা অফ করেনি’’ স্বভাব বশত বলে ওঠে। যখন বুঝতাম না তখন বিরক্ত হতাম। আর এখন নিজে যখন ইলেকট্রিসিটির জন্য প্রিপেইড কার্ড রিচার্জ করতে যাই তখন বুঝি মা কতোটা মেপে মেপে চলেছে।

সংসারের টুকরো টুকরো খরচ কমলেই যে বড় একটা অংশ সেভিংস হবে এটা খুব বুঝি এখন। মাকে দেখেছি বাইরে কোথাও গেলে খাবার বাসা থেকেই রান্না করে নিয়ে যেত নইলে শুকনো কিছু নিয়ে যেতো যেন বাইরে খাবার খরচটা না হয়। মা তার সঞ্চয়ের অনেকাংশ  ব্যয় করে অনাথ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া আর বৃদ্ধাশ্রমের জন্য। বাকীটা গ্রামের গরীব মানুষদের চিকিৎসা খরচ হিসেবে। কিছু অংশ প্রতিমাসে আমাকে দেয়।

আমি মাসের প্রথম সপ্তাহেই সব বিলগুলো পরিশোধ করে ইলেকট্রিসিটির প্রিপেইড কার্ড রিচার্জ করে রাখি আর সিলিন্ডার গ্রাসের জন্য একটা এমাউন্ট রেখে দিই যেন শেষ হয়ে গেলে অপ্রস্তুত হতে না হয় কারণ আমিতো বাসায় সব সময় থাকিনা। নিজের কনভেন্স আর হাত খরচের একটা অংশ ব্যাংকে জমা রাখি। হাতে নগদ টাকা থাকলে কখনোই থাকে না খরচ হয়ে যায়। একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট রাখি বিকাশ একাউন্টে যেন ফোন রিচার্জ করতে পারি কিংবা প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতে পারি। মাসের শুকনা বাজার একবারে করে ফেলি আর মাছ-মাংস-কাচাবাজার দুই সপ্তাহের জন্য কিনে রাখি। ছেলের স্কুলের কনভেন্স, বেতন, স্টেশনারীজ, মায়ের জন্য, বাসায় গেস্টের জন্য আলাদা খরচতো আছেই। এই ছোট্ট সংসার চালাতে মাসে প্রায় ষাট হাজার টাকা লেগেই যায়। সেখান থেকে মাত্র এক হাজার টাকা ব্যাংক সেভিংস রাখতে পারি। এই হচ্ছে সংসার খরচের আদ্যোপান্ত। তাই একটু হিসেব করে নিজের খরচের তালিকা করে গুছিয়ে নিলে সামলানো যায় সহজে। আর জমাও হয় একটু করে যা সংসারের জন্যে নিতান্তই অপরিহার্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *