follow us at instagram
Wednesday, February 19, 2020

যন্ত্রের সাথে সন্তানের বসবাস বিপদজনক

ডিভাইস তা হোক মোবাইল বা ট্যাব, চেনেন এমন কোন শিশু সম্ভবত একজনও নেই এখন আর। ছয় মাস থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ডিভাইস নির্ভরতা দেখে চমকে উঠতে হয়।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/08/devvv.png

আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছাড়া সব অচল। মোবাইল, ট্যাবলেট, কম্পিউটার, টেলিভিশন সবই আমাদের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শিশুরা খুব সহজে ও তাড়াতাড়ি এসব যন্ত্রের সাথে পরিচিত হয়ে যায় জন্মের পর পরই। টেলিভিশন অনেক আগের হলেও বাকিগুলো শিশুর জীবনে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে মূলত নব্বই দশকের পর থেকে। এখনকার বাবা-মায়েরাই হল প্রথম প্রজন্ম যাদের শিশুরা অনেক সময় বাবা-মায়ের চেয়ে যন্ত্রের উপর মনস্তাত্তিকভাবে বেশি নির্ভরশীল। তাই এখনকার অভিভাবকদের জন্য সময়টা অনেক চ্যালেঞ্জিং। কারণ, শিশুরা কম্পিউটার, মোবাইল ও ট্যাব ব্যাবহারের মাধ্যমে এমন অনেক কিছুই শিখছে ও জানছে যা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। এই উপকারিতার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অনেক বাবা-মা ভাবতেই পারছেন না তারা কতটা গভীর সমস্যায় পড়তে  যাচ্ছেন।

ডিভাইস তা হোক মোবাইল বা ট্যাব, চেনেন এমন কোন শিশু সম্ভবত একজনও নেই এখন আর। ছয় মাস থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ডিভাইস নির্ভরতা দেখে চমকে উঠতে হয়। প্রায়ই দেখা যায়, শিশুরা খেতে চাচ্ছেনা। তাদের খাওয়ানোর জন্য অভিভাবককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার পেছনে সময় দিতে হয়, লেগে থাকতে হয়। হয়তো মোবাইল বা ট্যাবে কোন ভিডিও দেখালে সেই দেখার সময় তাকে খাওয়ানো হচ্ছে।

অনেক শিশু টেলিভিশনের কার্টুনের উপরও একইভাবে নির্ভরশীল। আর এমনটা ঘটা শুরু করে শিশুর বয়স ৬মাস পেরোতে না পেরোতেই। পরে আর সে স্বাভাবিকভাবে খেতে পারেনা। অনেক অভিভাবকরা শিশুর কান্নাও এভাবে থামান। অনেকে আবার নেহাতই শিশুর খেলনা বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে শিশুর জন্য এধরণের ডিভাইস পছন্দ করেন। এমনকি অনেক বাবা মা স্রেফ শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য, যাতে শিশু তাদেরকে বিরক্ত না করে এজন্যও এসব ডিভাইস শিশুকে সরবরাহ করেন। তাদের ধারণা এতে শিশু স্মার্ট হবে, শান্ত হবে, মাঝখান থেকে তারাও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারবেন। তবে অনেক অভিভাবক মনে করেন, এসব ডিভাইস শিশুকে বাধ্য হয়েই সরবরাহ করতে হয়, কেননা এসব ডিভাইস শিশুকে যত তাড়াতাড়ি শান্ত ও বাধ্য করে, অন্য কিছু করেনা, তাছাড়া অন্য বাচ্চারাও ডিভাইস ব্যবহার করছে, ফলে তার বাচ্চার ব্রেন ডেভেলপমেন্ট বাধা প্রাপ্ত হবে যদি তাকেও ডিভাইস না দেয়া হয়।

ডিভাইস উপকারী কোন দিক থেকে

সত্যি কথা বলতে ২-১৮ বছর বয়সী শিশুদের মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যাবহারের উপকারিতা সামান্যই। এসব যন্ত্র ব্যবহারের সুফল পেতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে দিয়ে অভিভাবককে যেতে হবে। যেমন:

-সদ্যজাত শিশুর সান্নিধ্যে মোবাইলের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বন্ধ রাখতে হবে। কেননা মোবাইল ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোতে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর অন্ধ হবার মত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

– এসব ডিভাইসের সাউন্ড কম রাখতে হবে

-উত্তেজিত বা অ্যাডাল্ট কনটেন্ট, আইটেম সং, সহিংস ভিডিও কোন শিশুকে দেখানো যাবেনা বা শিশুদের সামনে দেখা যাবেনা

– অ্যামেরিকান একাডেমি অফ প্যাডিয়াট্রিক্স শিশুদের উপর ডিভাইসের প্রভাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করে অভিভাবকদের জন্য একটি মিডিয়া গাইডলাইন বের করেছে। সেই গাইডলাইন অনুযায়ী:

  • ০ থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশুদের কোন ধরণের ইলেকট্রনিক যন্ত্রের স্ক্রিন দেখানো যাবেনা।
  • ১৮-২৪ মাস বয়সী শিশুদের স্ক্রিন দেখানো যাবে তবে সেসব ডিভাইস অত্যন্ত উন্নত মানের হতে হবে। স্ক্রিন রেজ্যুলেশনও উন্নত এবং অ্যাপও শিশু উপযোগী হতে হবে।
  • ২-৫ বছর বয়সী শিশুরা স্ক্রিন দেখতে পারবে, তবে শিশুর সাথে একসাথে বসে দেখতে হবে এবং তা অবশ্যই ১ ঘণ্টার কম প্রতিদিন।

-সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় স্কুলের শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যখন ৫ বা ৬ ঊর্ধ্ব শিশুরা ট্যাব, কম্পিউটার বা মাল্টি প্রজেক্টের মাধ্যমে কিছু শেখে তখন। তবে আমাদের দেশে এখনও এধরণের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি স্কুলগুলোতে। সাধারণত প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা যথাযথ পদ্ধতি ও কারিকুলাম মেনে এধরণের শিক্ষাদান করে থাকেন। যদি স্কুল এমন কার্যক্রম হাতে না নেয়, বাসায় নিজেরা এভাবে শিক্ষা দেয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। সেটা না করাই ভাল।

 

শিশুর উপর ডিভাইসের প্রভাব

শিশুর উপর ডিভাইসের প্রভাব নিয়ে অনেক ধরণের গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। স্নায়ু বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু বিশেষজ্ঞরা নিয়মিতভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। অতএব, বাবা-মা হবার পর থেকে শিশু সান্নিধ্যে ডিভাইসের ব্যাবহার এবং শিশুর ডিভাইস ব্যাবহার নিয়ে সচেতন হতেই হবে, কেননা এটা শিশুর এবং নিজেদের জীবন মরণের প্রশ্ন রীতিমত। কিভাবে?

মস্তিষ্ক বিকাশে বাধা: 

গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার যা সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ও নেতৃত্ব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে, শিশু যদি ইন্টারনেট যুক্ত স্ক্রিনে প্রতিদিন ১ঘন্টার বেশি থাকে, তার ঐ গ্রে ম্যাটারে বাজে প্রভাব পরবেই নিশ্চিতভাবে। এছাড়া রক্তচাপ বাড়িয়ে সব ধরণের স্নায়ুর সাথে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করে। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যোগাযোগ দক্ষতা কমে যাওয়া: 

যেসব শিশুরা স্ক্রিনে অধিক সময় কাটায় তাদের সামাজিক দক্ষতায় ঘাটতি দেখা দেয়। নতুন বন্ধু তৈরি, দলবদ্ধভাবে কাজ করা, খেলাধুলায় ইত্যাদি স্বাভাবিক দক্ষতায় ঘাটতি তৈরি হয় । প্রয়োজনীয় পরিমাণ কথা বলায় অনাগ্রহী হয়। অনেক সময় বাচ্চাদের বেয়াদবি বা চিৎকার করতে দেখা যায়। কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারেনা, কথা বলার সময় চোখের বা মুখের দিকে তাকায় না, ফলে ব্যক্তিত্ব গঠন বাধাগ্রস্ত হয়।

শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা: 

অত্যধিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুর খাবার গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়, ঘুম হয় না যথেষ্ট পরিমাণ। ফলে শিশুর উচ্চতায় প্রভাব পরে। পুষ্টিহীনতাসহ,  চর্মরোগ, চোখে সমস্যা ইত্যাদি দেখা দেয়। এছাড়া খেলাধুলা না করায় শিশু মোটাও হতে পারে।

পড়াশোনার দক্ষতার অবনতি: 

অত্যধিক ডিভাইস ব্যবহারকারী শিশুর পড়াশোনার মানের অবনতি হয়, ফলে তারা ভাল ফলাফল করতে পারেনা। বিশেষত ভাষা ও গাণিতিক দক্ষতার ক্রমাবনতি ঘটে।

শিশুর সাথে অভিভাবকের সম্পর্কের অবনতি:

মাত্রাতিরিক্ত ডিভাইসের ব্যবহারের সবচেয়ে খারাপ দিক হল এটা বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুর মনোযোগ দেবার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা অল্পেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। তাই বাবা মায়ের অবাধ্যতা, কথা না শোনা, জেদ করা, মারামারি করা, মিথ্যা বলা, চুরি করা, আবেগ ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি ইত্যাদি আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।

বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যা প্রবণতা: 

গবেষক জিন টোয়েঞ্জ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যেসব শিশু কিশোররা অত্যধিক সময় সামাজিক যোগাযোগ সহ ইন্টারনেট  ব্যবহার করে তাদের ৪৮% এর মধ্যে আসক্তি ও আত্মহত্যা প্রবণতা অনেক বেশি রয়েছে । তারা বিষণ্ণতা সহ নানারকম মানসিক রোগেরও শিকার হয়। এছাড়া পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি তৈরি হতে পারে। সহিংস ভিডিও দেখে সহিংস হয়ে উঠতে পারে আপনার শিশুও।

          ডিভাইস আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় ও ডিভাইসের বিকল্প

খোদ স্টিভ জবস আর বিল গেটসের মত প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বরাই শিশুদের ডিভাইস ব্যবহারের বিপক্ষে। মোটকথা সীমিত ব্যবহার নিয়মানুযায়ী নিশ্চিত করেছেন শিশুদের সঠিক বেড়ে ওঠার স্বার্থে।

নিজেদের অভ্যাস পরিবর্তন:

নিজের অভ্যাসের পরিবর্তন না আনলে কোনভাবেই অবস্থার পরিবর্তন হবেনা। কার্পণ্য, শিশু সবসময় বাবা-মা ও পরিবারের অভিভাবকদের অনুকরণ করে। তাই শিশুর সামনে অত্যধিক ডিভাইস ব্যাবহার, যোগাযোগ মাধ্যমের নোটিফিকেশন চেক করা ইত্যাদি শিশুর সাথে সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । এতে শিশু নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করে। ফলে সেও পরবর্তীতে কারও কথার গুরুত্ব দেয়না।

ঘরে ডিভাইস ব্যবহারের নিয়ম তৈরি:

খাবার সময়, কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানের সময়, খেলাধুলা করার সময়, মোটকথা শিশুকে কোয়ালিটি টাইম দেবার সময় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করার মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া টিভি দেখার সময় সুনির্দিষ্ট করে সবাই মিলে দেখতে হবে। ভিডিও গেম খেলার সময় নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

বই পড়ার অভ্যাস তৈরি:

নিজে পড়তে হবে নিয়মিত আগে, ডিভাইস ব্যবহার বাদ দিয়ে। তাহলে সন্তানও তা অনুকরণ করবে। ঘরে বুক সেলফ থাকলে বা লাইব্রেরী তৈরি করতে পারলেও ভাল। ঘুমানোর আগে গল্প পড়ে শোনালে বই পড়ার অভ্যাস শিশু বয়স থেকেই তৈরি হয়। একবার বইয়ে অভ্যস্ত হয়ে পরলে ডিভাইসে আসক্ত হবার সম্ভাবনা অর্ধেকে নেমে আসবে শিশুর।

খেলাধুলার অভ্যাস করানো:

শিশুকে শারীরিক কসরতের খেলাধুলায় অভ্যস্ত করানো খুব সহজ। সেক্ষেত্রে বাবা-মা উভয়কেই অবদান রাখতে হবে। শিশুর সঙ্গী না থাকলে নিজেরাই খেলতে হবে তাদের সাথে। শিশুদের সাথে খেলাধুলা করলে নিজেদের শরীর-মনও ভাল থাকবে। তবে এখন খেলার জায়গার অনেক অভাব। সেক্ষেত্রে শিশুকে কোন উন্মুক্ত পার্কে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, বা বেসমেন্টে, ছাদেও খেলা যায়, নিজেদের ঘরের সামনে জায়গা থাকলে তো কথাই নেই। শিশুর যে খেলায় আগ্রহ সে খেলায় খেলাধূলাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিলেও ভাল কাজে দেবে। তাছাড়া বয়ঃভিত্তিক বিভিন্ন সৃজনশীল খেলনা আছে সেগুলো দিলেও শিশুরা সে ধরণের খেলায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। যেমন: পাজল, ব্লক, গাড়ি, হেলিকপ্টার যা জোরা লাগাতে হয়, খেলনা গিটার, বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি।

শিশুদের খেলনা বন্দুক, পিস্তল, রাইফেল, তরোয়াল ইত্যাদি উপহার দেয়া ঠিক না। ঘরে শিশু থাকলে বাবা-মাকে অনেক সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে হয়, বিনোদন ও আনন্দ এর মধ্য থেকেই খুঁজে নিতে হয়। শিশুর ডিভাইস ব্যবহার বিষয়ে অবহেলায় যে ক্ষতি, তা অপূরণীয়। শিশুর ডিভাইস ব্যবহারে এখন থেকে তাই আর কোন অনিয়ম ও অবহেলা নয়।

তথ্য সূত্র: ফোর্বস, মেন্টাল হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা, হেলথলাইন, ওয়ার্লড ইকনোমিক ফোরাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডট কো ডট ইউকে

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *