follow us at instagram
Tuesday, August 04, 2020

‘ছপাক’ সিনেমা, ভয়কে জয় করা এসিড আক্রান্ত মেয়ের সাহসী গল্প

ভারতে সিনেমা বা চলচিত্র অত্যন্ত প্রভাবশালী মাধ্যম, শুধু বিনোদনেরই নয়, সামাজিক বার্তাবাহকের কাজও করে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/Screenshot_2.png
Image Source: timesofindia.com

এক ফুটফুটে মিষ্টি কিশোরীর স্বপ্ন সে মডেল হবে কিংবা গাইবে টিভিতে। স্কুলের শিক্ষক ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও জনপ্রিয় সে। নিত্যদিনের স্কুলে যাওয়া আসার পথে সে অনেক যুবকেরই নজর কেড়েছে। কেউ তাকে শুধু তাকিয়ে দেখে, কেউ দৃষ্টি বিনিময় করেই খুশি, আবার কেউ দু কদম আগ বাড়িয়ে তার নামে ফুল পাঠায় ঘরে। সেই মেয়েটির নামই ছিল মালতী, পুরো নাম লক্ষ্মী আগরওয়াল। তাঁর নিত্য দিনের স্কুল যাওয়া আসায় বাধ সাধে এক অর্ধ উন্মত্ত তরুণ। লক্ষ্মীর উচ্ছলতা তাঁর পছন্দ না। 

সে খুব খারাপ এক মতলব এঁটে বসে। লক্ষ্মীর স্কুলে যাবার পথে মোটর সাইকেলে করে এসে তাঁকে হুমকি দিয়ে যায় একদিন সে যাতে লক্ষ্মী অন্য কোন ছেলের সাথে কথা না বলে। রাতে মোবাইলেও মেসেজ পাঠায়। তবু লক্ষ্মী তাঁর স্বাভাবিক জীবন অব্যাহত রাখলে সে একদিন রাস্তায় লক্ষ্মীকে এসিড ছুড়ে মারে। শুধু চেহারাই নয়, নষ্ট হয়ে যায় লক্ষ্মীর মডেল আর শিল্পী হবার স্বপ্ন। 

প্রত্যাখ্যাত পুরুষের ছুড়ে দেওয়া অ্যাসিডে কিশোরী লক্ষ্মী আগরওয়ালের মুখ ঝলসে যাওয়ার খবরটি শিরোনামে এসেছিল তখন। এমন অনেক ঘটনা ঘটলেও লক্ষ্মী সবার থেকে আলাদা হয়ে উঠেছিল। কারণ সে এই ঘটনার পরে জীবনকে থেমে যেতে দেয়নি, দুর্বিষহ হতে দেয়নি। লজ্জা ও ভয়কে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে লক্ষ্মী পাল্টা লড়াই শুরু করে। হসপিটাল থেকে আদালত পর্যন্ত– সেই লড়াইটা অনেক দীর্ঘ, কঠিন। তার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ফেস-রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি।

এর মাঝেই কিশোরী লক্ষ্মী তারুণ্যে পদার্পণ করেন। লক্ষ্মী দমে যান নি, থেমে যাননি, চরম হতাশাগ্রস্ত পরিস্থিতি থেকে, সেই ভীষণ চেহারা নিয়েও লক্ষ্মী উঠে দাঁড়িয়েছেন। যে এসিড ছুড়ে তার জীবনে পাহাড় সমান প্রতিবন্ধকতা আর যন্ত্রণা তৈরি করেছে, তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য লড়াই করেছেন। সে লড়াই শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়, তাঁর মত অগণিত নারীর জন্য যারা এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে, ভবিষ্যতে কেউ যেন এমন ভয়াবহ বর্বরতার সম্মুখীন না হয়, কোটি কোটি নারীর নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য লক্ষ্মী আগরওয়াল লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। 

‘ছপাক’ ছবি এই অসাধারণ লড়াকু নারীর গল্প বলে। লক্ষ্মী আগরওয়ালের জীবন নিয়ে নির্মিত এই ছবিটির মূল উদ্দেশ্য পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজে এসিড আক্রান্ত এক নারীর উলটো দিকে চলার গল্প বলা যার বহিরঙ্গের সৌন্দর্য বিপন্ন হলেও অন্তরের সৌন্দর্য আর সাহস অটুট রয়েছে।  লক্ষ্মী তাঁর সেই অটুট সাহসে ভর করে আরও লাখো কোটি নারীকে দিয়ে যাচ্ছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা। এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন সময়ের অন্যতম সেরা পরিচালক মেঘনা গুলজার। এর আগেও তিনি নারীকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে ছবির গল্প লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন যা সাধারণত এই উপমহাদেশে কম দেখা যায়। তাঁর তালভার, রাজি’র পরে এই ছবিটি তাই সবাই আরও ভাল ও নতুন কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে দেখেছে। 

‘ছপাক’ এ অবশ্যই নতুন কিছু আছে। দীপিকা পাড়ুকন এর আগে এমন এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্র আগে করেনি। নতুনভাবে দেখেছে দর্শক দীপিকাকে লক্ষ্মীর রূপে। লক্ষ্মী চরিত্রের প্রতি অবিচার করেনি দীপিকা। ভাল অভিনয় করেছেন তিনি। এসিড আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেবার পর যখন প্রথমবার লক্ষ্মী নিজের চেহারা আয়নায় দেখে চিৎকার করে ওঠে সেই দৃশ্যটি দর্শক হিসেবে মনে গেঁথে থাকার মত আজীবন। 

স্ক্রিপ্ট রাইটিং আর পরিচালনায় মেঘনা গুলজার বরাবরই দারুণ। সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা না পেলেও একেবারে খারাপ বলেননি কেউ। ছবিটি সামাজিক এবং এর মূল উদ্দেশ্য ভাল বার্তা দেয়া যা করতে কার্পণ্য করেনি এই ছবি। সহচরিত্রগুলোতেও বিক্রান্ত মাসে, মধুরজিৎ সারঘি, বৈভবী উপাধ্যায়, পায়েল কাপুর ও ছিলেন অসাধারণ। 

এই উপমহাদেশে এসিড এমন একটি উপাদানের নাম যার ব্যবহার এর চেয়ে অপব্যবহারের কথাই মানুষ বেশি জানে। গবেষণা, শিল্প কারখানা ইত্যাদির ক্ষেত্রে এসিডের ব্যবহার ব্যাপক হবার কারণে খোলা বাজারেও এটি বিক্রি হত। মাত্র ৩০ টাকায় এক বোতল এসিড চাইলেই পাশের ফার্মেসি থেকে যেকেউ কোন প্রমাণপত্র না দেখিয়েই কিনতে পারত। যার বদৌলতে সন্ত্রাসীরা একে সুলভ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। 

আমাদের দেশে এক সময় পত্রিকা খুললেই ধর্ষণের মত এসিড নিক্ষেপ অর্থাৎ এসিড সন্ত্রাস এর ঘটনা পড়তে হতে প্রতিদিন। এসিড সন্ত্রাস এর হার ছিল অত্যন্ত উর্ধমূখী। কিন্তু এখন আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য ভাবে এসিড নিক্ষেপের হার কমে গেছে, প্রায় ঘটেনা বললেই চলে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে মূল কারণ শাস্তি বৃদ্ধি, দ্রুত শাস্তি কার্যকর, খোলা বাজারে এসিড বিক্রয় বন্ধ করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশে এসিড নিক্ষেপের শাস্তি এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ অনুযায়ী এসিড সন্ত্রাসে মৃত্যু হলে বা কোন অঙ্গ যেমন চোখ, কান, মুখমণ্ডল, ও অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে , সেই সাথে দিতে হবে ১ লাখ টাকা জরিমানা।

ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এসিড নিক্ষেপের শাস্তি ভারতে তুলনামূলক ভাবে দুর্বল বাংলাদেশের চেয়ে। লক্ষ্মীর ঘটনা এজন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে লক্ষ্মীর ঘটনার মাধ্যমেই ভারতে এসিড নিক্ষেপের শাস্তির আইন পরিবর্তন হয়েছে। ২০১০ সালে লক্ষ্মীর ঘটনায় অপরাধীর প্রথমবারের মত ১০ বছরের কারাদণ্ড ও দশ লাখ রুপির জরিমানা প্রদানের রায় দেয় আদালত। এর আগে একই অপরাধে মাত্র ৩ বছরের সাজার আইন ছিল। এবং এই আইন পরিবর্তনের জন্য লক্ষ্মী আগরওয়ালকে আধা যুগেরও বেশি লড়াই করতে হয়েছে। মূলত লক্ষ্মীর এই অসাধারণ অদম্য লড়াইই দেখেছে দর্শক ‘ছপাক’ এ। 

লক্ষ্মী এখন একজন টিভি-র সঞ্চালিকা এবং অ্যাসিড আক্রমণ বন্ধ করার কর্মসূচীর উদ্যোক্তা।

ভারতে সিনেমা বা চলচিত্র অত্যন্ত প্রভাবশালী মাধ্যম, শুধু বিনোদনেরই নয়, সামাজিক বার্তাবাহকের কাজও করে চলচিত্র। কেননা, ৮৫ ভাগ ভারতীয় সাধারণত সিনেমাহলে যায় চলচিত্র দেখতে নিয়মিত এবং প্রত্যেক ভারতীয়ই জীবনের কোন না কোন সময় সিনেমা হলে যায়ই। ফলে এই সিনেমা ভারতে দারুণ গতিশীল এক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছে। এর আগেও ভারতে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ছবি হয়েছে এবং সেসব ছবি দর্শক নন্দিতও হয়েছে। যেমন মেয়েদের ঋতু কালীন পরিচ্ছন্নতা নিয়ে হয়েছে প্যাড ম্যান, স্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহার বৃদ্ধির সচেতনতার জন্য হয়েছে টয়লেট-এক প্রেম কথা। ঠিক তেমনি এসিড সন্ত্রাসকে প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে, নারীর ক্ষমতায়ন ও লড়াকু মনোভাবকে উৎসাহিত করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে এই চলচিত্র। এই গুরুত্বপূর্ণ ছবির প্রভাব তাই অসীম। এর মধ্যেই ছবিটিকে রাজ্য সরকার থেকে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এবং শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) ছপাক সিনেমাটি মুক্তির পর অ্যাসিড আক্রান্তদের জন্য পেনশন ঘোষণা করেছে উত্তরাখণ্ড রাজ্যসরকার। 

সবকিছুর পরেও নারী মানেই তাঁকে লড়াই করতে হবে সবসময়, সর্বস্তরে। নারী পরিচালক মেঘনা গুলজার এবং প্রযোজক ও কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা দেশ সেরা সেলেব্রিটি দীপিকা পাদুকোনকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে এখন এই সামাজিক ছবিটিকে নিয়ে। ছবি মুক্তির আগের দিন দিল্লীর জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আন্দোলনরত এক নির্যাতিত নারী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দীপিকা পাদুকোন। দীপিকার এ সরকার বিরোধী আইনের অবস্থানে দাঁড়ানোর কারণে ছবিটির দর্শকপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। ছবিটি নিয়ে সর্বস্তরের দর্শকের যে আগ্রহ মুক্তির আগে ছিল, তা আর এখন নেই। 

এমন একটি শুভ উদ্যোগ রাজনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়বে, এটি হতাশাজনক। যদিও ছবির দর্শকপ্রিয়তার উপর ছবির উদ্দেশ্য ও কালের ফ্রেমে টিকে থাকা না থাকা নির্ভর করে না। কালের লিটমাস টেস্টে ‘ছপাক’ টিকে যাবে এর সামাজিক বার্তা, ভাল পরিচালনা ও ভাল অভিনয়ের দরুন। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি সবারই দেখা দরকার। তবে আর দেরী কেন, দেখে ফেলুন অনলাইনে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *