follow us at instagram
Tuesday, August 04, 2020

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী বাবা-মেয়ের সফলতার গল্প লিখলেন বিল গেটস

শিশুমৃত্যু হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশের বাবা-কন্যা মাইক্রোবায়োলজিস্টের দুজনের কাজের প্রশংসা করেছেন বিল গেটস।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/Untitled-5-5e1f6928a338b.jpg
Image Source: samakal.com

শিশুমৃত্যু হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশের বাবা-কন্যা মাইক্রোবায়োলজিস্টের দুজনের কাজের প্রশংসা করেছেন মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এটি সত্যিই অভাবনীয় ও অনুপ্রেরণার। ড. সমীর ও তাঁর মেয়ে সেঁজুতি সাহা শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করে যাচ্ছেন ঢাকার শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশনে (সিএইচআরএফ)। সেঁজুতি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মলিকুলার বায়োলজিতে পিএইচডি করেছেন।

১৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিল গেটস তার ব্যক্তিগত ব্লগ গেটসনোটসে লিখেছেন, গবেষণার মাধ্যমে বাবা–মেয়ে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আরও এসেছে অনেক তথ্য। সেঁজুতি সাহা, ছোটবেলা থেকে পরিবারের মাঝে বেড়ে ওঠা সেই মেয়ে যার স্মৃতিতে ভাসে রাতের খাবারের সময় বাবা-মার কথোপকথনে প্রায়ই শুনতে পাওয়া ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস এবং সংক্রামক রোগগুলির বেড়ে চলার গল্প।

খাবারের সময় এমন রোগ বালাইয়ের আলাপ অনেকের মনে আঘাত হানতে পারে কিন্তু সাহা পরিবারের জন্য এমন ঘটনা ছিলো খুবই স্বাভাবিক। পরিবারের প্রধান ও সেঁজুতির বাবা ডাঃ সমীর সাহা তার প্রতিদিনের কাজ নিয়েই ঘরে ফিরতেন। মাইক্রোবায়োলজির একজন অধ্যাপক, সমীর তার বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা অনুশীলন করতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ গুলি সম্পর্কে প্রতিদিন যা শিখতেন তা পরিবারের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাতের খাবারের সময়টিকেই বেছে নিয়েছিলেন। আর বাস্তব জীবনের সে চ্যালেঞ্জের গল্পগুলো শুনতে, নানাবিধ রোগ সম্পর্কে জানতে ও শিখতে সেঁজুতি যেন মুখিয়ে থাকতেন।

ছোটবেলার সে কথোপকথন গুলি সেঁজুতির মনে বড় এমন ছাপ ফেলেছিল, যে তিনি নিজেই জীবাণু বিজ্ঞান বা মাইক্রোবায়োলজিতে ক্যারিয়ার গড়েন। ডাঃ সেঁজুতি সাহা এখন তার বাবার সাথে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনে (সিএইচআরএফ) কাজ করেন, যা বাংলাদেশসহ ও অন্যান্য দেশে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যকারী সংস্থা হিসেবে সেবা প্রদান করে চলেছেন।

পিতা-কন্যার এই গতিশীল জুটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য রক্ষার্থে আশীর্বাদ স্বরূপ।

তারা স্বল্প আয়ের দেশ ও ধনী দেশগুলির মাঝে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহে যে প্রতিবন্ধকতা আছে তা পূরনে নিরলস কাজ করে চলেছে। সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ডেটা, অত্যাধুনিক ডায়াগনস্টিকস এবং ভ্যাকসিন ব্যবহার করছে যেন শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পায়। তাদের গবেষণাটি কেবল বাংলাদেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে না, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যারা সমজাতীয় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারাও এই গবেষণার সুফল ভোগ করছে।

সিএইচআরএফ-এর কাজের পাশাপাশি সরকার গৃহীত স্বাস্থ্যসেবার যৌথ ও জোরালো উদ্যোগে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুর মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে এবং সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হয়েছে। ১৭০ মিলিয়ন মানুষের দেশে, ভ্যাকসিন ও টীকার আওতা আজ ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

ঢাকা শিশুহাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজির বিভাগীয় প্রধান ডাঃসমীর, শৈশবে শিশুর দু’টি বড় হত্যাকারী মেনিনজাইটিস এবং নিউমোনিয়ার জন্য বাংলাদেশে ভ্যাকসিন প্রচলনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই ভ্যাকসিনগুলি আমেরিকা এবং অন্যান্য ধনী দেশগুলিতে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশে তা সহজলভ্য ও প্রচলিত ছিল না। এই রোগগুলির ঝুঁকি তুলে ধরতে নিরলসভাবে কাজ করা, সমীর জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের উভয় ভ্যাকসিনের প্রচার ও ব্যবহারের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা এবং প্রমাণ সরবরাহ করেছিলেন, যা ইতিমধ্যে হাজার হাজার শিশুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে।

সেঁজুতি দরিদ্র দেশগুলিতে ছড়িয়ে থাকা সংক্রামক রহস্যজনক অসুস্থতা যা নবজাতক এবং শিশুদের প্রভাবিত করে তা নির্ণয়ের সহজ উপায়গুলি সন্ধানের দিকে মনোনিবেশ করেন। ২০১৭সালে, যখন বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে মেনিনজাইটিসের কারণে এক অব্যক্ত বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে তখন সেঁজুতি শিশুদের জিনগত উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করে রহস্যটি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন মেনিনজাইটিস রোগগুলি মশার দ্বারা প্রস্তুত চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রকোপ জনিত কারণে ঘটেছিল। তবে রহস্যের গোড়ায় যাওয়ার জন্য তাকে বিশ্লেষণের জন্য আমেরিকাতে নমুনাগুলি পাঠাতে হয়েছিল। ভবিষ্যতে মেনিনজাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত সমাধানে দেশকে সহায়তা করতে তিনি এখন থেকেই একটি স্বল্পব্যয় নির্ধারণকারী সরঞ্জাম স্থাপনের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

বাবা ও মেয়ে তাদের গবেষণা থেকে যে সংগ্রহ  করছে তার এনালিসিস করা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য, যার মধ্যে অসুস্থতা নির্ণয় এবং চিকিত্সা করার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর সংস্থা নেই। সিএইচআরএফ সংগ্রহকৃত ডেটাগুলির সহায়তায় সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর উপায় প্রয়োগে সরকারী নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। নতুন ভ্যাকসিন ডিজাইনেও সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে দেশের বৃহত্তম শিশুস্বাস্থ্য সেবা প্রদানের সুবিধা থাকলেও যেখানে প্রতিবছর ৬০০০ এর অধিক শিশুকে ভর্তি করানো সম্ভব হয় না কারণ ৬৬৫ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি সারাবছর পূর্ণ থাকে। অনেক শিশু রোগী সেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে লড়ছে যাদের তাত্ক্ষণিক যত্নের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ যদি রোগপ্রতিরোধে আরও বেশি কিছু করতে পারে তবে অপ্রতিরোধ্য অসুস্থতার ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগ দেয়া সম্ভব হবে যা স্বাস্থ্যসেবার মানকে উন্নত করার পাশাপাশি রোগনির্মূলে অবদান রাখবে। সমীর এবং সেঁজুতি কে তাদের নিরলস কাজ ও অবদানের জন্য ধন্যবাদ। তাদের প্রয়াসে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের হার কমছে এবং হাসপাতালে সেবা সুবিধা বাড়ছে।

তথ্যসুত্রঃ গেটসনোটস। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *