follow us at instagram
Friday, December 04, 2020

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছবির ইউরোপ জয় ও বাংলাদেশের উজ্জ্বল মেয়েরা

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ রুবাইয়াত হোসেন এর নতুন সিনেমা। এই ছবির কাহিনী লিখেছেন ফিলিপ ব্যারি ও রুবাইয়াত হোসেন নিজেই।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/made_in_bangladesh_6.jpg
Image Source: thedailystar.net

সিনেমার স্বপ্নটা সত্যজিৎ রায় তাঁর চোখে এঁকেছিলেন অনেককাল আগে। এরপর পার হয়েছে বহু সময়। আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি অসাধারণ কিছু কাজ। রুবাইয়াত হোসেন, যার সিনেমায় বাস্তবতা এসেছে শিল্প হয়ে। নারী এসেছে শক্তিশালী রুপ নিয়ে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ তাঁর নতুন সিনেমা। এই ছবির কাহিনী লিখেছেন ফিলিপ ব্যারি ও রুবাইয়াত হোসেন নিজেই।

রুবাইয়াত হোসেন পরিচালক হিসেবে নবীন নন। তিনি শক্তিশালী পরিচালক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর তিনটি ছবির প্রতিটিই পুরস্কৃত ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। ২০১১ সালে তিনি ‘মেহেরজান’ নির্মাণ করেন এবং ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন এর কাহিনী ও নির্মাণশৈলীর জন্য। এর কাহিনীও লিখেছিলেন তিনি। ছবিটি ১৯৭১ এর যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এক বাঙ্গালী নারী ও পাকিস্তানী সেনার প্রেম কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছিল। যুদ্ধকে নয়, ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের প্রভাবকে ঘিরে ছিল মূলত ছবির গল্প। কাহিনী বিতর্কিত হওয়ায় আলোচনা তুঙ্গে উঠেছিল তখন এবং ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

এরপর রুবাইয়াত বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ও একজন নারী অভিনেত্রীর দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধরণের কাহিনী নিয়ে নির্মাণ করেন ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। এই ছবিটিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছিল। বাংলাদেশের আধুনিক চলচিত্রের তালিকার বেশ উপরেই থাকবে আন্ডার কনস্ট্রাকশনের নাম। প্রতিকূল পারিবারিক ও সামাজিক বেড়াজালের ভেতরে থেকেই একজন প্রতিভাবান নারী অভিনেত্রীর বিকশিত হবার গল্প বলেছে এই ছবি। 

কিন্তু ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ যেন আগের গুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। ছবির কাহিনী ও নির্মাণ অসাধারণ। ছবির কাহিনী বিবর্তিত হয়েছে সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পোশাক শিল্পে কর্মরত ডালিয়ার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াৎ এর কাহিনী লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশের চলচিত্রের তথাকথিত গল্পগুলোতে সাধারণত নারীকে ‘হিরো’ হিসেবে দেখানো হয়না, আসলে দেখানোর কল্পনাই করা যায়না। সেখানে এই ছবিতে ডালিয়াকে দেখানো হয়েছে হিরো হিসেবে। তাঁর চরিত্রের বিকাশ, কর্মকাণ্ড, ডায়ালগ, তাঁর মুভমেন্ট বলে দেবে সে ই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শুধু নয়, আসলে সে ই গল্প। 

সিনেমাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব জয় করে ইউরোপে মুক্তি পেয়েছে। এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরের সিনেমা হলগুলোতে সগৌরবে চলছে। প্রবল দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে বিশেষত ফ্রান্সে। বাংলাদেশে এখনও মুক্তি পায়নি। দুঃখজনক সত্য হল, আমাদের দেশের দর্শক এবং সিনেমাহল মালিকরা কাহিনী নির্ভর ছবির কদর চিরকালই কম বুঝেছেন কিংবা বোঝেনইনি। সিনেমা হল মালিকরা দোষারোপ করেন দর্শকের ওপর আর দর্শকরা দোষারোপ করে পরিচালক ও কাহিনীকে। আইটেম সং কিংবা ভাল অ্যাকশন দৃশ্য ছাড়া এখনও আমাদের দেশের সিনেমাহলগুলোতে দর্শকের ঢল নামেনা। ফলে ভাল গল্পের পরিচালক ও প্রযোজকের কপাল খোলারও সুযোগ কম। 

কেন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ দেখতে হবে

১। মেড ইন বাংলাদেশ’ না দেখার আসলে কোন কারণ নেই। ছবিটি একটি মুক্ত চলচিত্র (Independent film) অর্থাৎ পাওয়ার হাউজ আর্ট। বাংলাদেশী কাহিনীকার ও পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শক্তিশালী গল্প, অসাধারণ বাস্তব ধর্মী অভিনয়, দুর্দান্ত নির্মাণশৈলী দেখতে যারা চান, তাদের জন্য Must watchছবিটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, নভেরা হোসেন, দীপান্বিতা মার্টিন, পারভিন পারু, মায়াবি মায়া, মোস্তফা মনোয়ার, শতাব্দী ওয়াদুদ, জয়রাজ, মোমেনা চৌধুরী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও সামিনা লুৎফা প্রমুখ। দুটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিতা চৌধুরী ও ভারতের শাহানা গোস্বামী।  

২। ছবিটি মুক্তির আগেই ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট মঙ্গলবার লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আর্টে ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ জিতেছে। পুরস্কার হিসেবে ছবিটি পাচ্ছে ৬ হাজার ইউরো। গত মে মাসে উৎসবের ওপেন ডোরস হাবে নির্বাচিত হয় নির্মিতব্য এই ছবি। বাংলাদেশের নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন এর পর এবার এই পুরস্কার পেলেন রুবাইয়াৎ হোসেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে দেশগুলোতে মুক্ত চলচ্চিত্রের চর্চা নেই বললেই চলে, সেসব দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সহায়তার জন্য কাজ করছে লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ওপেন ডোরস হাব’। সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) সহায়তায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করে সুইজারল্যান্ডের এই উৎসব। সহযোগী হিসেবে আছে একাধিক এশীয় ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান। 

৩। অষ্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডের (আপসা) ১৩তম আসরে ইউনেস্কোর কালচারাল ডাইভার্সিটি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে ছবিটি। ৭০টি দেশের চলচিত্রের সাথে প্রতিযোগিতা করেছেও ছবিটি।

৪। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর ছবিটি প্রদর্শিত হয় ৬৩তম বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে। ফ্রান্সের সেইন্ট জঁ দ্য-লুজ চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নেন রিকিতা নন্দিনী শিমু। ছবিটি ইতালির টোরিনো বা তুরিন চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছে ইন্টারফেদি পুরস্কার, নরওয়েজিয়ান পিস এওয়ার্ড এবং ফ্রান্সের এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নিয়েছে সেরা দর্শক পুরস্কার ও জুরি পুরস্কার সহ মোট ৩টি পুরস্কার।

৫। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ৭১টি হলে মুক্তি পায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। এছাড়া ফ্রান্সের ৫১টি থিয়েটার, ডেনমার্কে ৭টি থিয়েটার, পর্তুগালের ১টি থিয়েটারে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে ছবিটি। বর্তমানে ১০ম সপ্তাহ চলছে ফ্রান্সের ৮১টি থিয়েটারে। আর চলতি বছরে কানাডা ও আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশে মুক্তির জন্য ইতিমধ্যেই চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বলে জানায় খনা টকিজ। 

৬। ছবিটি বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে। ছবির কাহিনী লিখতে লেখকদ্বয় সময় নিয়েছেন পাক্কা দু বছর বা তাঁর কিছু বেশি।

৭। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হোম ভিডিও প্লাটফর্ম ক্রাইটেরিয়ন কালেকশান এর চলচ্চিত্র সাময়িকী- ‘দ্য কারেন্ট ‘দশের দশকের গুপ্তধন’ নামে ১০টি চলচ্চিত্রের তালিকা প্রকাশ করেছে। এখানে স্থান করে নিয়েছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছবিটি। এ ব্যাপারে রুবাইয়াৎ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে,

 

“ক্রাইটেরিয়নে সত্যজিৎ রায়, ঋতিক ঘটকের ফিল্ম রিস্টোর করে থাকে। তারা একেবারে আর্ট হাউজ প্লাটফর্ম, এক্সক্লুসিভ। কম সংখ্যক ছবি নিয়ে তারা কাজ করে।  তারা যখন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’কে গত দশকের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ছবির মধ্যে একটি হিসেবে রেখেছে, এটা আমার জন্য খুব সারপ্রাইজের ব্যাপার। নিউজটা আমাকে আমেরিকান ডিস্ট্রিবিউটরা মেইলে জানায়। সেখানে তারা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’কে সত্যজিৎ রায়ের ছবির সঙ্গে তুলনা করা করেছেন! সেটাও আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। কারণ, সত্যজিৎ রায়ের ফিল্ম দেখে আমি ফিল্ম বানানোর আগ্রহ পাই।”

৮। শন বেকার, এরি এস্টন, লেসলি হ্যারিস, এলেক্স রস পেরি, ড্যানিয়েল স্মিথ, সুসান সিডেলম্যান, জুলি তৈমর ও গ্রেগ মোত্তোলার মত প্রতিথযশা চলচ্চিত্র পরিচালকরা মনে করেন দশের দশকের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ একটি যা যথেষ্ট প্রচার প্রচারণা পায়নি। 

 

আমেরিকার  সমালোচক ও প্রখ্যাত পরিচালক লেসলি হ্যারিসের চোখে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’

‘মেড ইন বাংলাদেশ’কে সত্যজিৎ রায়ের ছবির সাথে তুলনা করেছেন এই ফরাসী সমালোচক ও পরিচালক। তিনি মনে করেন চলচ্চিত্রটির গল্প বলার ধরণ এর প্রধান চরিত্রের মতই শান্ত, সুসংহত ও পরিচ্ছন্ন যা ভারতের সর্বকালের সেরা মহান চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’-এ এই দশকের গুরুতর কিছু সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে।- যেমন, শ্রমিকদের উপর বৈশ্বিক শোষণ, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও বাণিজ্যিক লোভ। এছাড়া আরও রয়েছে এই দশকে ঘটে যাওয়া নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার নারী শক্তির জাগরণের মত সার্বজনীন বিষয়ও। লেখক-পরিচালক রুবাইয়াৎ হোসেন নান্দনিক ও সিনেম্যাটিক ক্যামেরা মুভমেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ঢাকা শহরের উজ্জ্বল রঙের ছোঁয়া, প্রাণবন্ত বিন্যাস ও দগদগে ক্ষত। লেসলির মতে এটি নারীদের সংহতি, বন্ধুত্ব, এবং আশঙ্কার গল্প যেখানে নারীরা পরস্পরকে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে। 

 ছবিটির মূল প্রযোজক ফ্রঁসোয়া দ্য’আক্তেমেয়ার (ফ্রান্স) ও আশিক মোস্তফা (বাংলাদেশ) এবং যৌথ প্রযোজক পিটার হায়েল্ডাল (ডেনমার্ক) ও পেদ্রো বোর্হেস (পর্তুগাল)। ছবিটি বাংলাদেশের খনা টকিজ ও ফ্রান্সের লা ফিল্মস দ্য এপ্রেস-মিডির ব্যানারে নির্মিত হয়েছে। 

ভাবুন আমাদের দেশে রাজধানী ঢাকা হোক কিংবা ঢাকার বাইরের শহর/মফঃস্বলের কোন সিনেমা হল হোক, ১ সপ্তাহও কোন বাংলাদেশী সিনেমা টিকে থাকতে পারছেনা এখন আর। যেসব ছবি সফল হচ্ছে সেগুলোকেও ১ সপ্তাহের ভেতরই দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সংখ্যক হলে মুক্তি দিয়ে মূলধন উঠিয়ে আনার কথা ভাবতে হয়। সেখানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ এর মত ছবি ফ্রান্সের মত দেশের ৮১টি হলে মাস খানেকের বেশি সময় ধরে সগৌরবে চলছে। কেননা, মুক্তি পেয়েছিল ৫১টি হলে, সেটা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৮১। তাঁর মানে দর্শক কতটা ভালবাসার সাথে গ্রহণ করেছে ছবিটি ভাবুন। এই সময়ের মধ্যে ইয়োরোপজুড়ে এই ছবিটি প্রতিযোগিতা করেছে ফরাসী ও ইয়োরোপীয় সেরা ছবিসহ হলিউডের জোকার, ম্যারেজ স্টোরি ও  আইরিশম্যানের মত সারা জাগানিয়া ছবিগুলোর সাথে এবং টিকে আছে। ভেবেই অবাক আর বিস্ময়াভিভূত হয়ে যাচ্ছি চলচিত্রপ্রেমী হিসেবে। সত্যি বলতে কি গর্বও হচ্ছে। এই প্রথম কোন বাংলাদেশী ছবি নিয়ে গর্ব করাটা অসামঞ্জস্য মনে হচ্ছেনা। অতএব গর্ব করুন এবং অপেক্ষা করুন ইয়োরোপ জয় করে ঘরে ফেরা এই ছবিটির জন্য।  

ছবির অফিশিয়াল ট্রেইলারেও চোখ রাখুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *