follow us at instagram
Thursday, April 09, 2020

বাংলাদেশের গৃহবধূ থেকে ব্রিটেনের র‍্যামসগেট শহরের মেয়র রওশন আরা

বাংলাদেশী মেয়ে রওশন আরা ব্রিটেনের র‍্যামসগেট শহরের প্রথম এশীয় মেয়র। বাংলাদেশী মানুষেরা গর্বভরে নামটি স্মরণ করতে পারেন।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/raushanmayor-620x381-1558437553080.jpg
Image Source: dhakatribune.com

বাংলাদেশী মেয়ে রওশন আরা ব্রিটেনের র‍্যামসগেট শহরের প্রথম এশীয় মেয়র। বাংলাদেশী মানুষেরা গর্বভরে নামটি স্মরণ করতে পারেন। ব্রিটেন এবং বাংলাদেশ দুটোই তাঁর দেশ। একটির জন্মসূত্রে নাগরিক তিনি, আরেকটির কর্মসূত্রে। দুই দেশের সাথে সম্পর্ক তাঁর আত্মার। তাই তিনি ব্রিটেনের নাগরিক হয়েও জন্মভূমির কর্তব্য পালনে দ্বিধা করেন না।

প্রবাসীদের সাফল্য দেশের কোন কাজে লাগে কি?

আমাদের দেশের মানুষের ধারণা সাধারণত প্রবাসে যারা প্রতিষ্ঠিত এবং ভিনদেশে যেসব বাংলাদেশী বাস করেন, বিশেষত যারা মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরব ছাড়া অন্যান্য মহাদেশ অর্থাৎ ইয়োরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া থাকেন, তাদের আর দেশের কোন কাজে লাগেনা; তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন না; এমনকি ভাবমূর্তিতেও অবদান শূন্য এমন একটি তথাকথিত সম্পূর্ণ ভুল ধারণা চালু আছে অনেকের মধ্যে।

প্রবাসী তা তারা যেদেশেই থাকুন না কেন, যদি সুনাগরিক হন সেদেশের, তারা বহুমুখী অবদান রাখতে পারেন। তারাও দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, অনেকে মাতৃভূমির এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, মসজিদ মাদ্রাসা উন্নয়নে অংশগ্রহণ করেন। অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। এভাবে তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করেন। যারা এসব করতে পারেননা, তারাও বিদেশে সুনামের সাথে কাজ করলে দেশের মেধার সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকে। কোন প্রতিষ্ঠানে কোন বাংলাদেশী দক্ষতার সাথে কাজ করলে ঐ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশী কর্মসন্ধানীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে স্বাভাবিকভাবেই। অনেক প্রবাসী অন্যান্য বাংলাদেশীদের কাজ পেতেও সহায়তা করেন। এছাড়া উন্নত শিক্ষা লাভ এবং গবেষণা করেও দেশের জন্য কাজ করার কথা ভাবেন অনেকে। এমনকি যারা তেমন কিছু করার সুযোগ বা সময় পাননা তাদের দ্বারাও অন্যরা উপকৃত হন অনুপ্রাণিত হয়ে। এখন পৃথিবী ছোট, তাই বিদেশের মাটিতে বসেও চাইলে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করছেন অনেকেই নানাভাবে।  মোটকথা, প্রবাসে খ্যাতি পেয়েছেন, বিদেশী নাগরিকত্ব পেয়েছেন অথচ জন্মসূত্রে কোন বাংলাদেশীর ভাল কাজ মানেই হচ্ছে দেশের অর্জন, কোন না কোনভাবে। 

সেরা প্রবাসী বাংলাদেশী বাঙ্গালি…

তাই সেরা প্রবাসী বাংলাদেশী বাঙ্গালির যদি তালিকা করা হয় রওশন আরা রহমান এর নাম থাকবে তালিকার শুরুতেই। এক দেশে জন্মগ্রহণ করে আরেক দেশে  রাজনৈতিক সাফল্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়। কেননা, নিজেকে প্রমাণ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। আর ব্রিটেনের মত দেশের রাজনীতি তো আরও কঠিন, বলা যায় দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন রাজনীতি চলে সেখানে। তাই নিজেকে ভাল নেতা হিসেবে জনতার কাছে প্রমাণ করা শুধু মেধা আর পরিশ্রম সাধ্যই নয়, অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তি, সাহসিকতারও ব্যাপার। তবে সততা ও উদারতা অনিবার্যভাবে চর্চা করতেই হয়। আমাদের মত দেশগুলোর রাজনীতিবিদদের থেকে আলাদা তারা নিশ্চিতভাবে। তাই রৌশন আরা রহমান এর পক্ষে ব্রিটেনের শহরের প্রথম নারী এশীয় মেয়র পদ অর্জন রীতিমত বৈপ্লবিক।   

রাজনৈতিক সাফল্য

সহযোগী ও মনোযোগী স্বভাবের রৌশন আরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে লেবার পার্টিতে কাজ করতেন। মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, সহযোগিতা করার কার্যকরী কৌশল ও পরিশ্রম দেখে লেবার পার্টি থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রায় ৫০ হাজার লোকের শহর রামসগেট শহরের জন্য। মূলত পেশায় ব্যবসায়ী। রৌশন আরা বাবার সাথে লন্ডন যান যখন তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন। লন্ডন এসেও তিনি পড়াশুনায় সাফল্য অর্জন করেন। ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে স্বামীর হোটেল ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাদের রেস্তোরার নাম ‘তন্দুরি’। 

ব্যবসায়ের পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সেবা দিতে পছন্দ করতেন তিনি। লেবার পার্টিতে যোগদানের পর লেবার পার্টির হয়ে বহু মানুষের উপকার করেছেন তিনি। তাঁর স্বেচ্ছাশ্রম আর ঐকান্তিকতা দিয়ে পার্টির আস্থা ভাজন হয়েছেন। লেবার পার্টি থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মত মনোনয়ন পেয়েছিলেন, কিন্তু খুব স্বল্প ব্যবধানে হেরে যান প্রতিপক্ষের প্রার্থীর কাছে। ২০১৯ এর ১৪ মের নির্বাচনে বিপুল ভোটে যুক্তরাজ্যের রামসগেইট শহরের মেয়র নির্বাচিত হন রৌশন আরা ।

রামসগেট শহরের মেয়র হলেও বাংলাদেশ এর প্রতি ভালবাসা তাঁর শিরা উপশিরায় বহমান।  সেবা ও দানশীলতা তাঁর মজ্জাগত। তাঁর জন্মস্থান সিংগাইরের উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা কাশিমপুর (কাঁঠাল বাগান) গ্রামে। বাবা প্রকৌশলী রজ্জব আলী ছিলেন এলাকায় দানবীর হিসেবে খ্যাত । তিনি ছিলেন বুয়েটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। রজ্জব আলী তিনি ১৯৬৭ সালে নিজের পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে যান। এলাকায় নিজের জমিতে তিনি মসজিদ, ঈদগাহ, রাস্তা এবং বেশকিছু ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। এবং সব সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। 

তাঁর এই গুণের ধারা পেয়েছেন কন্যা রওশন আরাও। বাবার মহৎ কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এখনও তিনি প্রতিবছর সময় করে বাংলাদেশে আসেন। গ্রামের মানুষজনের জন্য কিছু করার তাগিদে রামসগেট শহরের সাথে মিল রেখে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যার নাম রামস-বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা। সংস্থার মাধ্যমে দেশে প্রতিবছর বন্যার সময় ত্রাণ, শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এছাড়া ব্যক্তিগত খরচে এলাকার দরিদ্রদের চোখের অপারেশন করিয়েছেন রৌশন আরা রহমান।

রাজনীতিতে সফল হবার আগেও তিনি আরেকবার নজরে এসেছিলেন দেশ ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালবাসার কারণে। দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরতে রৌশন আরা রহমান ও তাঁর স্বামী রেজাউর রহমান প্রায় এক যুগ আগে একটি রিকশা নিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনে। সেময় বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছিল যা বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও প্রচারিত হয়েছিল।

বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের সম্পর্ক আন্তর্জাতিকভাবে আরও কার্যকর ও ঘনিষ্ট হোক, এই চেষ্টাও চলে তাঁর অবিরাম। তাঁর এই ভিন্ন ধারার স্বদেশের ঐতিহ্য প্রেম আর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের গল্প প্রেরণা হয়ে ধরা পড়ুক হাজার নারীর জীবনে।

তথ্যসূত্রঃ ডেইলি স্টার, যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন, কালের কণ্ঠ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *