follow us at instagram
Thursday, April 09, 2020

বিশ্বজুড়ে নারীরা বছরে ৩২৬ কোটি ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজ করেছে

সমাজে মায়েদের বা গৃহস্থালি কাজের সাথে যুক্ত থাকা নারীর পেশার ক্ষেত্রে গৃহিণী যে একটি পেশা এটা কোন পর্যায়ে স্বীকৃত নয়।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/Capture.PNG-kitchen.png

নারী তার জীবনে নানা রকম ভূমিকায় থাকে। কখনও মা, কখনও বোন, কখনও কন্যা, কখনও স্ত্রী বা প্রেয়সী। তার এইসব ভূমিকা সে পালন করে সংসারে, গৃহে। ঘরে নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সময় কাটায়, এমনকি যদি সে নারী কর্মজীবী হয়, তবুও। ঘর ও সংসারে নারী বেশি সময় কাটালেও সে কিন্তু বসে থাকেনা বা কোন কাজ ছাড়া অলস সময় কাটায় না। সমাজে মায়েদের বা গৃহস্থালি কাজের সাথে যুক্ত থাকা নারীর পেশার ক্ষেত্রে গৃহিণী যে একটি পেশা এই শিক্ষা আমাদের সমাজে দেয়া হয়না কাউকে শিক্ষা জীবনের কোন পর্যায়ে। আবার যদি গৃহিণী’ পেশা হিসেবে লিখিত বা মৌখিকভাবে উল্লেখও করা হয়, যেহেতু তার আর্থিক মূল্য আজও নির্ধারণযোগ্য মনে হয়নি কারও কাছে, তা ‘অমূল্য’ শব্দ থেকে বিবর্তিত হয়ে ‘মূল্যহীন’ বা ‘কিছু না’ তে এসে ঠেকেছে। অথচ হাজার হাজার বছর ধরে নারীর এই অর্থহীন বেহিসেবী শ্রমের মেরুদণ্ডেই গড়ে উঠেছে আমাদের সভ্যতার কাঠামো। 

 

বিশ্বজুড়ে নারীর পারিশ্রমিকবিহীন গৃহস্থালি কাজ…

এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী গড়ে প্রতিদিন ৪৫ রকম কাজ করে থাকেন ঘরে থাকলে। সাংসারিক বা গৃহস্থালি এসব কাজের মধ্যে রান্না থেকে শুরু করে ঘর দোর ঝাড়ু দেয়া, মোছা, বাথরুম পরিষ্কার করা, জামা কাপড় ধোয়া, বাচ্চা লালন পালন, থালা বাসন ধোয়া ইত্যাদি নানা রকম কাজ রয়েছে। কর্মজীবী নারীরাও বাইরের কাজ শেষ করে এসে সংসারে এসব কাজের কোন না কোনটিতে যেখানে অংশ নেন, সেখানে কর্মজীবী পুরুষের এসব কাজে অংশ নেবার হার খুব কম। কিন্তু এসব কাজের কোন অর্থমূল্য কখনও পায় না নারী। তাই একজন নারী বলা যায় জীবনের অজস্র কর্মঘন্টা পারিশ্রমিকবিহীনভাবে কাজ করে যা অমানবিক। 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অক্সফাম এর টাইম টু কেয়ারনামের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বজুড়ে এক বছরে নারীরা গড়ে ৩২৬ কোটি ঘণ্টা পারিশ্রমিকবিহীনভাবে কাজ করেছে। ভারতের অক্সফাম শাখা জানিয়েছে এই সময়ে যে অর্থ উপার্জন করা যেত তা এক বছরে ভারতের শিক্ষা খাতের বাজেটের ২০ গুণ। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ভারতের শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল ৯৩ হাজার কোটি রুপি। 

ক্রমবর্ধমান ধনী গরীব বৈষম্য তৈরির পেছনে…

এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা এই গবেষণার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়েছে আরেকটি নতুন বিষয়। আর তা হল ধনী গরীবের বৈষম্য। ভারতের মত বৃহৎ দেশের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে যে অর্থ আছে তা ৯৫ কোটি ৩০ লাখ মানুষের হাতে থাকা অর্থের ৪ গুণ। একজন নারী কর্মীর এই পরিমাণ অর্থ একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে উপার্জন করতে সময় লাগবে ২২ হাজার ২৭৭ বছর। 

নারীদের এই উৎপাদনশীল কর্মঘন্টার আর্থিক মূল্য জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছেনা। ফলে ধনী গরীব বৈষম্য তৈরির পেছনে নারীর এই পারিশ্রমিকবিহীন কর্ম ঘণ্টা একটি শক্তিশালী কারণ তৈরি করছে। যদি নারীরা এসব কাজের পারিশ্রমিক পেত এবং তা জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হত, তাহলে ধনী গরীব বৈষম্য এত প্রকট হত না। 

শুধু ভারতে না সারা বিশ্বজুড়ে একই কারণে ধনী গরীব বৈষম্য ক্রম বর্ধমান। অথচ, নারীর এই পারিশ্রমিকবিহীন গৃহস্থালি কাজকর্মই সমাজের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তে সহায়তা করছে কার্যকরভাবে। সারা বিশ্বে ৪৩ শতাংশ নারী এসব গৃহস্থালি কাজ করতে গিয়ে নিজের কেরিয়ার তৈরি করতে পারেনা। মাত্র ৬ শতাংশ পুরুষও একই কারণে চাকরি করতে পারেনা। বিয়ের পরে বেশিরভাগ নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয় এসকল পারিশ্রমিকবিহীন কাজের দায়িত্ব নিতে গিয়ে। যেসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করা যায়, সেখানেও সাধারণত নারী কর্মীর সংখ্যা বেশি থাকে। কিন্তু একই কাজ তারা ঘরে ফিরেও করে থাকেন যার কোন পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয়নি। 

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই সমস্যা নিয়ে বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যে মাথা ঘামাচ্ছেন এবং পদক্ষেপ নেয়াও শুরু করেছেন। অর্থনীতিবিদরা একযোগে মত দিয়েছেন নারীর এই পারিশ্রমিকবিহীন কাজের একটি নূন্যতম মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যাতে তার হিসেব থাকে, যাতে তা জাতীয় অর্থনীতি বা জিডিপিতে যুক্ত করা যায়। এতে ধনী গরীব বৈষম্যও কমে যাবার রাস্তা তৈরি হবে। 

বাংলাদেশের চিত্র

নারীর পারিশ্রমিকবিহীন কাজের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থা ব্যতিক্রম কিছু না। বরং একই চিত্র ফুটে উঠেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)র এক গবেষণা পত্রে দেখা গেছে  বাংলাদেশের নারীরা দৈনিক গড়ে ১৬ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন, কিন্তু এ বিশাল সময় কাজের বিনিময়ে তারা কোন মজুরি পান না। সব মিলিয়ে তাঁরা প্রতি বছর ৭৭ কোটি ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। এ পরিমাণ কাজের মোট অর্থমূল্য ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯৮১ কোটি থেকে ৯ হাজার ১০৩ কোটি ডলার। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ জিডিপিতে যুক্ত করা সম্ভব হলে দেশের জিডিপির আকার দ্বিগুণ হতো বলে উল্লেখ করা হয় ওই গবেষণায়। পুরুষের কাজের ৯৮ শতাংশই জিডিপিতে যোগ হচ্ছে অথচ নারীর কাজের মাত্র ৪৭ শতাংশ জিডিপিতে যোগ হচ্ছে।

যদি জাতীয় আয়ের সঙ্গে নারীদের অন্যান্য কাজের সঙ্গে পারিশ্রমিক বিহীন কর্মকাণ্ডের অবদান যোগ করা হয়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান ২৫ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হবে। আর পুরুষদের অবদান ৭৫ থেকে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে।

অথচ এগুলোর কোন আর্থিক স্বীকৃতি নেই, ফলে হিসেব নেই এসব অবদানের। অর্থাৎ বর্তমানে জাতীয় আয় যেভাবে হিসেব করা হয়, তাতে নারীর আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি উপেক্ষিত। বর্তমানে ৮৭ শতাংশের বেশি পুরুষ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে রয়েছে। নারী রয়েছে ৩৫ শতাংশের মতো। নানা প্রতিবন্ধকতায় তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে না। 

সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় বলা যায় নারী অবমূল্যায়িত হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে সর্বভাবে। এসব কারণেই নারীর মানসিক স্বাস্থ্য হুমকিতে থাকে। কেননা, বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার নারীরা হতাশায়ও বেশি ভোগে। একারণেই নারী আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা বেশি। নারীর শারীরিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত এসব কারণে নিঃসন্দেহে। মোটকথা, নারীর শ্রমের মর্যাদা না দেয়া জাতীয় অর্থনীতিসহ সবক্ষেত্রেই গভীরভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

সর্বোপরি,

সংসারের নারীর অবদানের আর্থিক স্বীকৃতি জাতীয় অর্থনীতিকে বেগবান করতে পারে। আর কর্মজীবী নারী পুরুষের ক্ষেত্রে উভয়ে মিলে ঘরের কাজগুলো সমানভাবে ভাগ করে করার চর্চা শুরু করতে হবে। আধুনিক যুগে নারী-পুরুষ উভয় উভয়কে শ্রমের মূল্য দেবার মাধ্যমে সব দিক থেকে বিকাশের সুযোগ দেবার চর্চা শুরু না করলে যতই আমরা শিক্ষিত হই না কেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতই আমাদের সামনে নিয়ে যাক না কেন, সমাজ পেছনেই পরে থাকবে।  

তথ্যসূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ভোরের কাগজ, ডয়েচে ভেলে, প্রথম আলো। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *