follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

দুই হাত ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে ফাল্গুনী আজ প্রতিষ্ঠিত কর্মকর্তা

ফাল্গুনী দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম আর সংগ্রাম করে অবশেষে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন মনের জোরে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/Capture.PNG-hand.png

তার কনুই থেকে দুই হাতের বাকি অংশ নেই। টানাপড়েনের সংসারে অকালে বাবাও নাই হয়ে গেল। কোনমতে মা সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন খেয়ে না খেয়ে। চার ভাইবোনের সংসারে কষ্ট আর অভাব ছাড়া যেন আর কিছুই নেই। থাকার মধ্যে ছিল এক পড়াশুনা। কিন্তু তাও প্রায় থেমে যাচ্ছিল। পরীক্ষা দেবার টাকাও একসময় ছিল না।

কিন্তু মনের জোর, পরিশ্রম আর মেধা এই তিনকে একসাথে বেধে পারি দিয়েছেন স্কুল মাধ্যমিক, কলেজ এবং সুযোগ পেয়েছেন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটিতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বেকার থাকেননি তিনি। দেশের শীর্ষ বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি সম্প্রতি। তিনি ফাল্গুনী সাহা। 

২০০২ সাল। ছোট্ট ফাল্গুনী তখন কেবল ৮ কি ৯। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। চঞ্চল পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে উঠে এসেছেন তিনি। ছুটোছুটি করে বেড়ায়। পাশের বাড়ির ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় সে। এতে তার হাতের কনুই পর্যন্ত পুড়ে যায়। 

প্রতিবেশী ও অভিভাবকরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু স্থানীয় হাসপাতালের অপর্যাপ্ত চিকিৎসায় তেমন কিছু হল না। সেখান থেকে বড় হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হল। বেসরকারি হাসপাতাল পোড়ার ধরণ দেখেতো ভর্তিই নিতে চায়নি। মাস চারেক এভাবে ঘোরাঘুরি করার পর বহু কষ্টে আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় নিয়ে যাওয়া হল কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শোনাল দুঃসংবাদ। হাতে ততদিনে সংক্রমণ ঘটেছে। হাতে পচন ধরেছে, এভাবে কিছুকাল থাকলে ক্যান্সার হবে। একারণে দুই হাতই কেটে বাদ দিতে হবে। জীবন বিনাশী ক্যান্সারের হাত থেকে বাচাতে ফাল্গুনীর দুই হাত কেটে বাদ দেয়া হল। হাতের ঘা শুকাতে মাস চারেক সময় লাগল। 

তখন সবাই ভেবেই নিল, মেয়েটির পড়াশুনার এখানেই ইতি। জীবনে আর কিছুই হবেনা।  কাগজ-কলম দেখলেই কান্না পেত। সহপাঠীদের স্কুলে যেতে দেখলে চোখ ভেঙ্গে জল গড়াত। কিন্তু মেয়েটি ফাল্গুনী। সে এত সহজে হাল ছেড়ে দেবেনা। যখন সবাই এভাবে ভাবছে, তখন সে দুই কনুই দিয়েই কলম তুলে নিল। সে ভাবল,‘পৃথিবীতে কিছুই তো অসম্ভব নয়। তবে আমি কেন পারব না?’ 

দুই কনুইয়ের ফাকে সে কলম নিয়ে লেখার অনুশীলন করতে লাগল। সবাই অবাক হল, কেউ কেউ হাসাহাসিও করল। কিন্তু সে তাতে কান দিল না প্রথমদিকে এলোমেলো হয়ে যেত লাইন। কলম ধরতে ধরতে একসময় হাতে ইনফেকশনও হয়েছিল। ডাক্তারও নিষেধ করেছিলেন এভাবে লিখতে। এক মনে লেখার অনুশীলন চালিয়ে গেল। এবং এক সময় অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে দুই কনুই দিয়ে লেখার কৌশলও খুব সুন্দরভাবে আয়ত্ত করে ফেলল। 

দুর্ঘটনার বছর আর পড়াশোনা হল না। পরের বছর তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে হল।  গলাচিপা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিল ফাল্গুনী। গলাচিপা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তাঁর সাফল্যে সবাইকে অবাক ও খুশি করল। ঢাকার ট্রাস্ট কলেজের অধ্যক্ষ বশির আহমেদ তাকে ঢাকায় এনে ট্রাস্ট কলেজে ভর্তি করান বৃত্তি দিয়ে। সেইসাথে ব্যবস্থা হল কলেজের হোস্টেলে থাকার। এইচএসসিতে মানবিকে জিপিএ ৫ পেয়ে ফাল্গুনী আবার প্রমাণ করল, মানুষ চাইলে সব সম্ভব। 

এইচএসসির ফলাফলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করার সুযোগ হয়েছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ভূগোলে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায় সে। ভর্তি হবার কিছুদিনের মাথায় মুদি দোকানদার বাবা জগদীশ চন্দ্র সাহার মৃত্যু হয়। মা ভারতী সাহা তখন তাঁর চার কন্যা সন্তান নিয়ে সত্যিই বিপদে পরে যান। ফাল্গুনীর বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার খরচ চালানোসহ কোন সন্তানের পড়াশুনার খরচই আর চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। মিষ্টির প্যাকেট বিক্রি করে সংসার চলছিল তাদের। ফাল্গুনী সাভারে একটি টিউশনি করত। কিন্তু দুই হাত না থাকায় শিক্ষার্থীর অভিভাবকের ধারণা হল ফাল্গুনী ঠিকমত পড়াতে পারবেনা। মাস দেড়েকের মাথায় তাই টিউশনিটাও চলে গেল। চরম অর্থকষ্টে পরে গেল ফাল্গুনী আবার। এসময় এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা আমেরিকা প্রবাসী চন্দ্র নাথের সাথে। তিনি বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন ফাল্গুনীর জন্য। অনার্সে সিজিপিএ ৩.৫০ পেয়েছেন। এখন সেখানে মাস্টার্সে পড়ছেন। 

এর মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ পান। সেখানেও ভাল ফলাফল করেন ফাল্গুনি। ব্র্যাকের চাকুরীর পরীক্ষায়ও তিনি ভাল ফলাফল করে সুযোগ পান এবং নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত হন। 

ফাল্গুনী দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম আর সংগ্রাম করে অবশেষে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন।

অভাব অনটনের পরিবারে তাঁর এ সুখবরে বইতে শুরু করেছে সুবাতাস। ছোট ছোট বোনগুলোর পড়ানোর দায়িত্ব এখন তাঁর। দারিদ্রের জোয়াল টেনে মা এখন অসুস্থ ও ক্লান্ত। ফাল্গুনীর স্বপ্ন এখন অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করানো, বোনেদের পড়াশুনা করিয়ে স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে তৈরি করা। এই সোশ্যাল মিডিয়া আসক্ত চাকরি নাই , চাকরি নাই করে হাহাকার করা প্রজন্মের কাছে ফাল্গুনী সাহা এক দৃষ্টান্ত। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টা, আগ্রহই আজ তাঁকে তাঁর স্বপ্নময় অবস্থানে এনে দাড় করিয়েছে। ফাল্গুনীকে দেখেই মনে হয় আসলে সবই সম্ভব, ইচ্ছে করলে। প্রয়োজন শুধু লেগে থাকা, আর আগ্রহ অবস্থা পরিবর্তনের। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *