follow us at instagram
Wednesday, February 19, 2020

ঢাবি শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহানা একমাত্র নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত

শাহানা আক্তারের নিরপেক্ষ বিজয় সবার কাছে নিঃসন্দেহে একটি দৃষ্টান্ত। এটি অনুপ্রেরণা দায়ক ঘটনা বৈকি।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/02/counsilor-sahana-akter.jpg

এবারের ঢাকা সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচনে একমাত্র বিজয়ী নারী শাহানা আক্তার। এবারের সিটি নির্বাচনে মোট ১২৯ ওয়ার্ডের বিপরীতে মোট কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন ৫৮৬ জন। এর মধ্যে মাত্র ২৪ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে ২ জন, বি এন পি ৪ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। এর বাইরে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী ছিলেন ১৮ জন। মোট ২৪ জনের মধ্যে বিজয়ী হয়েছেন একজন মাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী। আর তিনিই হলেন শাহানা আক্তার। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনীতির মাঠে আজকের এই দিনেও অংশগ্রহণ কৃত নারী পুরুষের অনুপাত অপ্রত্যাশিতভাবে কম এবং এর ফলশ্রুতিতে বিজয়ী বা নির্বাচিত নারী কাউন্সিলর এর সংখ্যা আরও কম, রীতিমত তলানিতে এসে ঠেকেছে।  

যাহোক, প্রশ্ন উঠেছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা এত কম কেন এবং সেই সাথে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নারী প্রার্থীর বিজয় কেন এত কঠিন। সেই প্রশ্নের উত্তর আছে শাহানা আক্তারের বিজয়ে। নারী প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী দুটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন। আর তা হল দলীয়ভাবে মনোনয়ন না পাওয়া ও তুলনামূলক ভোটার সংখ্যার কম উপস্থিতি। সে অনুযায়ী নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল আরও কম।  দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, পেশিশক্তি ও অর্থ শক্তি। এ দুইয়ের কোনটাই তেমন ছিল না নারী প্রার্থীদের। ফলে নির্বাচনের কঠিন পরীক্ষায় নারীরা হেরে গেছেন। এ পরাজয়ের কারণে ভবিষ্যতে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাবে। কারণ তার পরিবার তাকে আর সহযোগিতা দেবে না।

অতএব, নারী প্রার্থীর বিজয় আমাদের নাগরিক ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

ঢাকা শহরের একমাত্র নারী কাউন্সিলর শাহানা আক্তারকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কোন প্রতিবন্ধকতা। বয়সেও সবচেয়ে তরুণ এই কাউন্সিলর রাজনীতির মাঠে প্রতিশ্রুতিশীল। তাই তাঁর এলাকার জনগণ তাঁর উপরেই রেখেছে ভরসা। শাহানা   ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৭ নং ওয়ার্ডে তাঁর রেডিও প্রতীকে ৩ হাজার ৯৬২ ভোট পেয়েছেন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাসির আহম্মদ ভুঁইয়া (টিফিন ক্যারিয়ার মার্কা) পেয়েছেন ২ হাজার ২৫০ ভোট।

কে এই শাহানা আক্তার? 

সেবা ও রাজনীতির বাতাবরণে বড় হয়েছেন শাহানা। ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন বাবা কমিশনার সাইদুর রহমানকে দেখেছেন এলাকাবাসীর সেবা নিয়ে কতটা বিচলিত থাকতেন এবং পরিশ্রম করতেন। টানা ২৫ বছর বাবা সাইদুর রহমানকে কমিশনার হিসেবে কাজ করতে দেখেছেন। পিতার পরিচয় তাকে এলাকাবাসীর কাছে চিনতে বা পরিচিতি পেতে সহায়তা করেছে বলে তিনি মনে করেন। 

বর্তমানে শাহানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত। এর আগে তিনি ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এলএলএম সম্পন্ন করেছেন। রাজনীতির মাধ্যমে জনসেবা করাকেই তিনি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই পড়াশুনার পাশাপাশি সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রাখতেন সবসময়। সেবা মূলক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে এলাকার নিম্ন আয়ের পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়াসহ নানারকম সেবামূলক কার্যক্রম করেছেন। 

ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং বিজয়

ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়া এবং বিজয়ের প্রক্রিয়াটা শাহানার জন্য মোটেই এলাম দেখলাম জয় করলাম টাইপের ছিল না। তিনি অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মত পেশিশক্তি বা অর্থের ব্যবহারও করেন নি। 

শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবার থেকে এলেও শাহানা জনসংযোগে ছিলেন অনেক এগিয়ে। মানুষের ঘরে ঘরে গেছেন তিনি। নারী কিশোর তরুণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠ সবাইকে অনুরোধ করেছেন ভোট দিতে সেই সাথে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এলাকার মূল সমস্যা- মাদক, জলাবদ্ধতা ও দূষণ রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। এগুলো প্রতিরোধ ও প্রতিকার করাই এখন কাউন্সিলর হিসেবে তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

প্রচারণার সময় অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। পোস্টার লাগানোর পরে তার পোস্টার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মীরা ছিঁড়ে ফেলত। রাতে দেয়ালে স্টিকার লাগানোর পর সকালে গিয়ে দেখা যেত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এমনকি প্রশাসন দিয়েও হয়রানি করা হয়েছে। তবে কোনকিছুতে দমে যাননি। বিজয়ী হওয়ায় মনোবল বেড়েছে তার। জানালেন এখন তিনি কাউন্সিলর হলেও পড়াশোনা বাদ দেবেন না তিনি। এতে যদি দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, তাও করবেন তিনি। 

যে কারণে এই বিজয় অনুপ্রেরণাদায়ক

আমাদের দেশের নগর পর্যায়ের এই তৃণমূল রাজনীতিতে একজন শিক্ষার্থীর নির্বাচিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।  গত এক দশক ধরে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের ভেতরে ছাত্র রাজনীতি বা রাজনীতি বিষয়ে যে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে তা আশংকাজনক। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে এই প্রজন্মের ভেতরে অনীহা ও আস্থাহীনতা জন্মেছে যা দেশের জন্য অশুভ। শাহানা আক্তারের এই নিরপেক্ষ বিজয় একটি দৃষ্টান্ত সবার কাছে নিঃসন্দেহে।  নারী ও তরুণ রাজনীতিবিদদের কাছেও এটি অনুপ্রেরণা দায়ক ঘটনা বৈকি। 

দুঃখজনক সত্য হল গণ প্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। ছোট-বড় কোনও দলই সে শর্ত পূরণ করতে পারেনি বা ইচ্ছে করে করেনি। নারীদের সংরক্ষিত আসনে রাখার মধ্যেই তাঁদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে। আশা করা যায়, শাহানা আক্তারের এই বিজয়ে তাদের কাজ ও মনোভাবে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো, একুশে টিভি নিউজ, কালের কণ্ঠ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *