follow us at instagram
Thursday, February 20, 2020

১২ হাজার মেয়েকে পাচার থেকে বাঁচিয়ে অনুরাধা পেলেন ‘পদ্মশ্রী’

১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুরাধা কৈরালা তাঁর সংস্থার মাধ্যমে হাজারো নারীকে পাচারকারীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/02/al20170126225300.jpg
Image Source: amritabazar.com

অনেক বছর আগের কথা। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর পশুপতি মন্দিরে প্রতিদিন সকালে হেটে যাওয়া আসা করতেন তিনি। একদিন দেখলেন ভাল স্বাস্থ্যবতী বেশ কয়েকজন নারী রাস্তার ধারে বসে ভিক্ষা করছে। তিনি কৌতুহলবশত তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন তারা ভিক্ষা করছে। সবাই বলল তারা কোন না কোন সহিংসতার শিকার কেউ পারিবারিক কলহ ও অত্যাচারের শিকার হয়ে ঘর ছেড়েছে, কাউকে গ্রাম থেকে এনে শহরে বিক্রি করা হয়েছিল, কেউ এইচ আই ভিতে আক্রান্ত। 

জিজ্ঞাসু নারী তখন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তাদের জন্য কিছু করবেন। প্রতিদিন তিনি ঐ একই রাস্তায় হেটে মন্দিরে যেতেন আর ফেরার পথে ঐ ভুক্তোভুগি নিঃস্ব নারীদের সাথে কথা বলতেন, বলতেন নারীর ক্ষমতায়ন ও সম্ভাবনার কথা, সহিংসতা বিষয়ে সচেতনতার কথা, বলতেন তারা আরেকটু পরিশ্রমী ও সচেতন হলে তারা তাদের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন। একদিন তিনি সত্যি সতী ঐ নারীদের একটি অভূতপূর্ব প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। বললেন, তিনি তাদেরকে কিছু করার জন্য টাকা দেবেন যদি তারা ভিক্ষাবৃত্তি ত্যাগ করে। ভিক্ষাবৃত্তির বিশেষত সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তির চক্র ছেড়ে নির্বিঘ্নে বেড়িয়ে আসা যতটা সোজা মনে হয়, আদতে তত সহজ মোটেই নয়। সবাই এলো না। এলো আট জন নারী। তিনি তাদের প্রত্যেককে ১ হাজার করে টাকা দিলেন রাস্তার ধারেই পণ্যের ছোট ছোট পশরা সাজিয়ে বসার জন্য। এবং সেইসাথে তাদের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তাও নিয়ে নিলেন যে প্রত্যেককে প্রতিদিন তাকে ২ টাকা করে ফেরত দিতে হবে। প্রতিদিনের এই ২ টাকায় তাদের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি তিনি আরও অসহায় নারীদের সহায়তা করতে পারবেন।

খুশির বিষয় হল, তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো সফল হয়েছিল, প্রতিদিন অনেক কেনা বেচা হত। ঐ এলাকায় নারীদের ভিক্ষাবৃত্তি তিনি এভাবে বন্ধ করেছিলেন। তবে কদিন বাদেই দেখান গেল, ঐ নারীরা তাদের শিশু, বিশেষত মেয়ে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে আশ্রয়ের জন্য আবার তার কাছে এসেছে। তিনি তখন দুইটি রুম ভাড়া নিলেন এবং সেখানে ১০টি শিশুকে আশ্রয় দিয়ে তাদের খাবার ও সুস্বাস্থ্য  নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু তিনি শিক্ষক মানুষ। সীমিত আয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। এভাবে সেভাবে ধার করে আর ব্যক্তিগত পরিচিত মানুষের দানে কোনভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলেন তার ঐ ছোট্ট আশ্রয়ের সেবা কেন্দ্রটি। তখন তার এক বন্ধু তাকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (এন জি ও) এর নিবন্ধন নিতে বললেন যাতে খরচ চালাতে সুবিধা হয়। তখন তিনি মাইটি নেপালনামে তার ঐ ছোট্ট সেবা কেন্দ্রটি নিবন্ধন করেন। এভাবেই গড়ে ওঠে মাইটি  নেপাল। আর ঐ পরম দয়াময়ী পরিশ্রমশীল নারীর নাম হল অনুরাধা কৈরালা।  

এমন হাজারো অসহায় নারীর আশ্রয় হয়েছে অনুরাধার মাইটি নেপাল নামক সংস্থায়।  ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুরাধা কৈরালা তাঁর এ সংস্থার মাধ্যমে মোট ৫৭ হাজার নারীকে পাচারকারীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। এর মধ্যে সংস্থায় নিবন্ধিত উদ্ধারকৃতের সংখ্যা ১২ হাজার এবং প্রতিরোধ করে পাচারকারীদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন বিভিন্নভাবে  ৪৫ হাজার নারীকে ভারত নেপাল সীমান্ত এলাকা থেকে। এ সংস্থাটির ৩টি প্রতিরোধ কেন্দ্র (যেখানে পাচার-কৃত বা সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের কাউন্সেলিং সেবাসহ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়), ১১ টি রেস্কিউ সেন্টার, ২টি সেবা কাম নিরাময় কেন্দ্র এবং একটি স্কুল। এসব কেন্দ্রে ভুক্তোভুগী নারী ও শিশু – কিশোরীদের পুনর্বাসনের জন্য সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং দেয়া হয়, চিকিৎসা দেয়া হয়, ভাইরাস নিরোধী চিকিৎসা, খাবার ও আশ্রয় দেয়া হয়, শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় যেমন হোটেল ম্যানেজমেন্ট, টেইলারিং ও কম্পিউটার এর উপর এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হয়। 

প্রথম যে মেয়েটিকে তিনি পাচারকারীর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন ঝুঁকি নিয়ে তাঁর নাম ছিল পুনম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাকে মুম্বাইয়ের এক বারে বিক্রি করা হয়েছিল। তাকে তিনি তাঁর সেফ হাউজে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। পুনম এখন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং সে এখন ওয়ার্ল চিলড্রেন প্লাই, স্টকহোম, সুইডেন সংস্থার জুরি মেম্বার। সে এখন সারা বিশ্বের শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করতে চায়।  

অনুরাধার কৈরালার মত একজন সাধারণ নারী স্কুল শিক্ষক এর পক্ষে কখনও এত বড় সেবামূলক কাজে আত্মত্যাগী মনোভাব ও কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সম্ভব হত না। এ কাজ করতে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথেও কাজ করেছেন। ভারত নেপাল উভয় দেশের নারীদের বিশেষত সীমান্তবর্তী নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন তাঁর সংস্থার মাধ্যমে যাতে আর কোন নারীকে পাচারকারীর হাতে পরতে না হয় বা সহিংসতার শিকার হতে না হয়।

আর এ পরিশ্রম ও সাধনার স্বীকৃতিও পাচ্ছেন তিনি।

২০১০ সালে তিনি সি এন এন এর সেরা দশ ওয়ার্ল্ডওয়াইড হিরোর তালিকায় ছিলেন।  সি এন এন তাঁর কাজের স্বীকৃতি সরূপ ১ লক্ষ ২৫ হাজার ইউএস ডলার দান করে যার পুরোটাই তিনি মাইটি নেপাল এর কার্যক্রমে ব্যয় করেন। এবং আমেরিকান সরকারও ৫ লক্ষ মার্কিন ডলার দান করে মাইটি নেপালকে। ২০১৪ সালে তিনি মাদার তেরেসা পুরষ্কার লাভ করেন। ২০১৭ সালে পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মশ্রী। ২০১৮ সালে তিনি পেয়েছেন গ্লোবাল অর্ডার অফ ডিগনিটিস অ্যাওয়ার্ড।

তিনি বিশ্বাস করেন তিনি একজন নারীবাদী। এই দক্ষিণ এশিয় অঞ্চল অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক। তাই নারীর প্রতি পুরুষের নির্যাতনের ঘটনাও বেশি ঘটে পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার চেয়ে। নারী ও শিশু পাচার এসব পুরুষতান্ত্রিক আচরণেরই অংশ।  নারী ও শিশু পাচার একটি ভয়াবহ অপরাধ। নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে এবং শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে পুরুষকে। কন্যা সন্তানকে গর্ব ও মর্যাদার প্রতীক মনে করতে হবে প্রত্যেক পুরুষকে। তাহলে এই ভয়াবহ অপরাধ আর সংঘটিত হবেনা, পৃথিবী হবে সব শিশুর জন্য আরও সুন্দর ও নিরাপদ। 

তথ্যসূত্রঃ টেড এক্স গেটওয়ে, শি দ্যা পিপল, উইকিপিডিয়া, সি এন এন, মাইটি নেপাল ওয়েবসাইট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *