follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

বাংলাদেশের মেয়ে স্বপ্না কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত দুই দেশে

মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার’র কান্ট্রি ডিরেক্টর বা বাংলাদেশ প্রধান স্বপ্না ভৌমিক, অনেক মেয়ের অনুপ্রেরণা।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/02/SAPNA-VOUMIK-2002100905.jpg
Image Source: https://www.ekushey-tv.com/

আধুনিক বিশ্ব বিশেষায়নের যুগ। কোন একটি বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান বা দক্ষতা না থাকলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া দিনকে দিন অসম্ভব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষায়িত জ্ঞান শুধু চিকিৎসা বিদ্যা, প্রকৌশল বিদ্যা, স্থাপত্য ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে আটকে নেই। যদি কেউ উদ্যোক্তা হতে চায় কিংবা বাজার ব্যাবস্থাপনাবীদ হতে চায়, তাকেও সে বিষয়ে গভীরভাবে জানতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন এসব বিষয়ের চাহিদা ও উপযোগিতাও ব্যাপক। ঠিক তার উল্টোদিকে কমে যাচ্ছে মৌলিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানভিত্তিক পড়াশুনার চাহিদা। যেমন দর্শন, পদার্থবিদ্যা, গণিত, ভাষা ও সাহিত্য ইত্যাদি। যদিও এসব বিষয়ের উপযোগিতা কোনকালেই কম ছিল না বা ভবিষ্যতেও কমে যাবেনা। কিন্তু চাহিদা আর উপযোগিতা এক নয়। তাই এসব মৌলিক বিষয়ের শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে গিয়ে কিছুটা হিমশিম খাচ্ছে। কেউ কেউ প্রচলিত ধারার চাকরি যেমন বিসিএস, মানব উন্নয়ন সংস্থার কর্মী কিংবা শিক্ষকতা ইত্যাদি পেশায় যুক্ত হয়ে যায়। আর কেউ কেউ নতুন দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে উভয় প্রকার জ্ঞানের সমন্বয় করে এগিয়ে যায়, ছড়িয়ে পরে বিভিন্ন পেশায়, কেউ কেউ উদ্যোক্তাও হন। এরকমই একজন স্বপ্না ভৌমিক।

স্বপ্নার স্বপ্ন শুরুর গল্প

পড়েছিলেন দর্শনের মত মৌলিক বিষয়ে। স্বপ্নের ক্যাম্পাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, শিক্ষার্থী থাকাকালীন, এটাই ছিল তাঁর স্বপ্নের সর্বোচ্চ চূড়া। কিন্তু পড়াশুনা শেষ হবার ঠিক আগে আগে পেলেন নতুন কৌতূহলের বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে নানা রকম কর্মশালা, ইভেন্ট ইত্যাদি লেগেই থাকে। স্নাতক হবার আগে আগে রপ্তানি মুখী পোশাক শিল্প নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ভর্তি হন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউএফটি)। স্বপ্না প্রচণ্ড পরিশ্রমী ছিলেন। বিজিএমইএ তে ভাল ফলাফল করেন। ভাল ফলাফল এর কারণে বিভিন্ন দেশীয় গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পান। কিন্তু গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান মানেই ভয়াবহ পরিশ্রম, কারখানা পরিদর্শন, নানা রকম মানুষের সাথে কাজ করার চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্না মানুষের সাথে মিশতে পছন্দ করতেন। তাই কাজটা স্বপ্নার জন্য ইন্টারেস্টিং হয়ে গেল। কিন্তু যেখানে গিয়ে স্বপ্না বড় ধরণের ধাক্কা খেলেন তা হল গার্মেন্টস এর কর্ম পরিবেশ। স্বপ্না দেখলেন বেশিরভাগে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের জন্য বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। ব্যবস্থাপনায় নারী কর্মীদের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই নারী কর্মীদের সুবিধা অসুবিধা দেখারও কেউ নেই। শুধু নারীদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে স্বপ্না শেষ পর্যন্ত গার্মেন্টস সেক্টরে কেরিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

কাজ শুরু করেন দেশীয় প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ গ্রুপে। সেখানে প্রধান কার্যালয়ে কাজ করার পাশাপাশি সপ্তাহের ৪ দিনই কারখানা পরিদর্শনে যেতে হত। সুতা থেকে কাপড় উৎপাদন পর্যবেক্ষণ, পোশাক তৈরির সময় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভুল নির্ণয় ও সংশোধন, মেশিনপত্র রক্ষণাবেক্ষণ পর্যবেক্ষণ ,শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সুবিধা অসুবিধা জানা ও ব্যবস্থা নেয়া ইত্যাদি ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ’ সব ধরণের কাজই করতেন তিনি। স্বপ্না বলেন দিনে ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা সময় তিনি কেরিয়ারের প্রাথমিক বছরগুলোতে দিয়েছেন। একজন নারীর জন্য প্রতিদিন ঘুমানোর সময় বাদ দিয়ে এত সময় কর্মস্থলে দেয়া রীতিমত অভূতপূর্ব ব্যাপার। স্বপ্না নিজেও জানেন না তিনি কি এর মাধ্যমে কত বড় একটি পরিবর্তনের সূচনা করলেন। বেসরকারি ও শিল্প কারখানার ব্যবস্থাপনায় নারীদের কর্ম উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ করার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে আছে, সেখানে তিনি একটি বড় ধরণের ধাক্কা দিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন, নারী কর্মীরাও পুরুষের মত উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে পারে।

বিদেশী ব্র্যান্ডের সাথে পথ চলা

স্বপ্না রেনেসাঁয় কাজ করেছিলেন ২ বছর। সেখান থেকে প্রথম বিদেশী ব্র্যান্ড ‘নেক্সট’ এ মার্চেন্ডাইজার হিসেবে যোগ দেন। এরপর সুযোগ আসে বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ওয়াল মার্টে কাজ করার। বড় ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করে শিখলেন অনেক কিছু। ওয়ালমার্টের কলেবর যেমন কর্মী সংখ্যা অনেক বেশি, কর্ম পরিবেশও উন্নত। তাই সেখানে তাকে কাজ করতে বেশি বেগ পেতে হত না। ওয়াল মার্টে কাজ করার বছর দুয়েকের মধ্যে ডাক পান বিশ্ববিখ্যাত আর এক ব্র্যান্ড মার্ক অ্যান্ড স্পেন্সার (এমঅ্যান্ডএস) এর কাছ থেকে। মার্ক অ্যান্ড স্পেন্সার যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড যা বিশ্বব্যাপী ৮০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান যুগিয়ে যাচ্ছে।

তবে এটি ওয়ালমার্টের মত অবশ্যই বড় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশে এর কলেবর বেশ ছোট। বাংলাদেশে মাত্র ৩/৪ জন কর্মকর্তা কাজ করছিল। তাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের পরিসর বাড়াতে চাচ্ছে। স্বপ্না ভাবলেন, সেক্ষেত্রে তিনি এখানে কাজ করার অনেক বেশি সুযোগ পাবেন। শেখার এবং নিজেকে বিকাশের ক্ষেত্রও বেশি। তাই তিনি ওয়ালমার্ট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার পক্ষে ওয়ালমার্ট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া মোটেই সহজ ছিল না, কেননা, একেতো বড় কোম্পানি তার উপর তার মত দক্ষ কর্মীকে তারা ছাড়তেও চাচ্ছিল না। সবাই বেশ নিরুৎসাহিতই করছিল। কিন্তু স্বপ্না ভেবে দেখলেন এতে তার দীর্ঘমেয়াদী সব দিক থেকে লাভ হবে। কখনও কখনও দশ পা আগানোর জন্য ২/৩ পা পেছাতে হয়। শেষ পর্যন্ত ওয়ালমার্ট ছেড়ে তিনি এম অ্যান্ড এস এ যোগ দিলেন মার্চেন্ডাইজার হিসেবে।

এম অ্যান্ড এস কর্ম অভিজ্ঞতা

বিদেশী ব্র্যান্ড এবং বড় প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা সব সময় বিচিত্র। কেননা, পরিশ্রম করার মানসিকতা, দক্ষতা ও সততা না থাকলে টিকে থাকা অসম্ভব। স্বপ্না সেখানে মার্চেন্ডাইজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৬ সালে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তখন ছোট। লোকবল কম থাকায় একজন কর্মীকেই কয়েকরকম কাজ করতে হত। স্বপ্নাও মার্চেন্ডাইজার হিসেবে যোগ দিয়ে পোশাকের নকশা উন্নয়ন থেকে শুরু করে ক্রয়াদেশ দেওয়া এমনকি কারখানায় উৎপাদন পর্যায়েও কাজ করতেন। জরুরী দরকারে চট্টগ্রাম বন্দরেও চলে যেতেন । তার দক্ষতায় বাংলাদেশে এম অ্যান্ড এস এ এর পরিসর বাড়াতে প্রভাবিত করেছিল। ফলে ব্র্যান্ডের কর্তা ব্যক্তিদের নজরে চলে আসেন তিনি। ২০১৩ সালে তিনি যখন এম আন্ড এস এর কান্ট্রি ডিরেক্টর পদে আসীন হন স্বপ্না ভৌমিক

তাছাড়া বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যবস্থাপনা। দেশী বা বিদেশী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান, তা ছোট, মাঝারি বা বড় যা ই হোক না কেন ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়না মূলত বাংলাদেশীদের দুর্নীতি প্রবণতা ও অদক্ষতার কারণে। এর পরিবর্তে সুযোগ দেয়া হয় ভারতীয়সহ শ্রীলংকান ও শ্বেতাঙ্গদের।  অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার বিদেশী কর্মরত আছে। এদের মধ্যে ২০ হাজারই ভারতীয়। এরকম একটি সময় ও প্রতিকূল আবহে স্বপ্না একটি সম্ভাবনার নাম। তিনি খুলেও দিয়েছেন অনেকের জন্য সম্ভাবনার দ্বার। তিনি যখন এম অ্যান্ড এস এ যোগ দেন তখন বিদেশি ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কোন বাংলাদেশী ছিল না বললেই চলে।  ফলে কান্ট্রি ডিরেক্টর পদে স্বপ্নার এই পথ চলা এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত, শুধু নারীদের জন্য নয়, সব বাংলাদেশীদের জন্য। 

বাংলাদেশ প্রধান হবার অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশী হয়ে প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ হওয়াটা পোশাক শিল্প ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বেশ কঠিন। এর কারণ বিদেশী কর্মীদের আধিপত্য। তাছাড়া নারী হিসেবে তো চ্যালেঞ্জ রয়েছেই। সেসবতো জয় করলেনই স্বপ্না ভৌমিক, এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন যা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। তিনি প্রধান হবার পর প্রতিষ্ঠানে প্রস্তুতকৃত পোশাকের জন্য ৫৫ ভাগ কাপড় দেশীয় বস্ত্র কলগুলো সরবরাহ করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে। ডেনিমসহ অন্যান্য বেশ কিছু আইটেমও বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ  করছে এখন প্রতিষ্ঠানটি। কারখানা ও কার্যালয়ের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বেও এনেছেন ভারসাম্য। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫০ জন নারী এখন সুপারভাইজারসহ বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় পদে কাজ করছে।

এছাড়া নতুন প্রজন্মের যারা এই সেক্টরে আসতে চান, তাদের জন্য রয়েছে স্বপ্নার কিছু পরামর্শ:

কঠোর পরিশ্রমের কোন বিকল্প এবং শর্টকাট পথ নেই। পরিশ্রম করা শিখতে হবে। তাহলেই স্মার্টলি কাজ করা সম্ভব হবে।

শিখতে হবে প্রতিদিন, শেখার কোন শেষ নেই।

ধৈর্য থাকতে হবে

প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হতে হবে

টেক্সটাইল বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে ভাল

শেষ কথা

স্বপ্না ভৌমিক হওয়া কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়। ১৮/১৯ ঘন্টাব্যাপী কোন কাজ শুধু চাকরি করার স্বার্থে বা টাকার জন্য করা যায় না। কাজটাকে ভালবাসতে হয়। আর কাজ ভালবাসতে হলে লাগে পরিশ্রম করার মানসিকতা ও সততা। আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। শিক্ষিত স্নাতক বেকারের সংখ্যার জরিপে বাংলাদেশ বিশ্বে এখন চতুর্থ। অথচ, দেশের বেসরকারি খাতের একটি বড় অংশের উদ্যোক্তাদের বক্তব্য দক্ষ ও সৎ কর্মী তারা পাচ্ছেননা, তাই বাধ্য হয়ে বিদেশীদের সুযোগ দিতে হয়। আসলে সমস্যাটা তাহলে কোথায়? স্বপ্না ভৌমিকের পরামর্শের মধ্যেই হয়তো তার সমাধান আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *