follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অমর্যাদার গল্প ‘দেবী’ শর্টফিল্ম

দেবী সার্বজনীনভাবে নারীর বর্তমান অবস্থার গল্প।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/03/020320083322-5e5d203ae1b9cdevi-review.jpg
Image Source: peepingmoon.com

দেবীনামে একটি  স্বল্প দৈর্ঘ্য ভারতীয় চলচ্চিত্র সামাজিক যোগাযোগে ঝড় তুলেছে। ১৩ মিনিটের এই ছবিটি নারীর প্রতি শুধু ভারতের নয় আমাদের এই উপমহাদেশের চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিকৃষ্ট চেহারা ও প্রহসনমূলক আচরণের গল্প বলেছে। এবং সেটা এমন সূক্ষ্মভাবে বলেছে যা দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব দর্শকদের জন্য দৃষ্টি উন্মোচক হিসেবে কাজ করেছে। 

দেবী নামে যতগুলো চলচিত্র হয়েছে এযাবৎ তার প্রায় সবগুলোই বেশ সমৃদ্ধ। আসলে নামটাই এত বার্তা দিতে পারে যে, কোন পরিচালক বা লেখক একে যুক্তিযুক্ত না মনে করে পারেন না। কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায় দেবীনামে এক অসাধারণ সামাজিক ছবি বানিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর শর্মীলা ঠাকুরকে নিয়ে সেই সাদাকালো যুগে। ২০১৮ তে আমরা দেখেছি হুমায়ুন আহমেদ এর মিসির আলী সিরিজের উপন্যাস দেবীঅবলম্বনে জয়া আহসান ও চঞ্চল চৌধুরীর অভিনীত চলচিত্র দেবী। আর এবছর, ২০২০ এ এসেছে হিন্দি ভাষার স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচিত্র যার পরিচালক একজন বাঙ্গালী নারী- প্রিয়াঙ্কা ব্যানার্জী। আর অভিনয় করেছেন কাজল, নেহা ধুপিয়া, শ্রুতি হাসান, নীনা কুলকার্নীর মত অভিনেত্রীরা। কি আছে এতে? এর গভীরে যাবার আগে দেবী শব্দের মূলে যাওয়া যাক একটু।

দেবী ধারণার মূলে…

দেবী’, ছোট্ট এই পরিচিত শব্দটি হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের জীবন যাপন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু সংস্কৃতিই শুধু নয় দেবী শব্দটি যেন এই অঞ্চলের নারীর পরিচয়ের মূর্ত প্রতীক হয়ে ছিল এতকাল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে দুইভাবে দেখার রেওয়াজ আছে। ভোগ্য বস্তু হিসেবে এবং অতি মহীমান্মীত ব্যক্তিত্ব রূপে। দেবী হচ্ছে অতি মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের প্রতিরূপ, যেমন ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুরা দেবী দুর্গা, কালি, সরস্বতী, লক্ষ্মীর পূজা করে হিন্দুরা। এই রূপে নারীকে কল্পনা করা হয় বা বিশ্বাস করা হয় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আকারে যিনি সাধারণ মানুষকে তাদের বিশেষ অলৌকিক শক্তি দিয়ে নানা বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন এবং উপহার ও আশীর্বাদ দিয়ে জীবনকে ভরিয়ে দিতে পারেন। এছাড়া বাংলা ভাষার গোঁড়ার দিক থেকে আশির দশকের শেষ দিক পর্যন্তও শিল্প সাহিত্যে এবং বাস্তবেও কোন বাঙ্গালী বিশেষত হিন্দু নারীর নামের শেষে তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য দেবী শব্দটি যুক্ত করা হত। তবে এখন আর সে রীতি নেই। 

পুরুষতান্ত্রিক চোখ নিয়ে কখনও নারীর আসল সরূপ দেখা যায়না। নারী কোন ভোগ্য বস্তুও নয়, নারীকে মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব রূপে দেখারও আসলে কিছু নেই। নারীও মানুষ, তাই তাকে দেখতে হবে মানুষ হিসেবে। নারীকে ভোগ্যবস্তু দেখা হিসেবে যতটা ক্ষতিকর ঠিক ততটাই ক্ষতিকর তাকে মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব রূপে কল্পনা করা। এটা ক্ষতিকর ও প্রহসনমূলক, কারণ নারীকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের/স্রষ্টার এক প্রকার রূপ হিসেবে যারা কল্পনা করে তারাই আবার নারী প্রতি নির্যাতন, অসম্মান ও সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টিতে সবচেয়ে এগিয়ে। এর মানে আসলে তারা নারীর শক্তি, সামর্থ্য ও মনুষ্যত্বে বিশ্বাস করে না, মর্যাদা দিতে জানেনা বা শেখেনি। 

দেবী  যা বলে…

ছোট্ট একটি কামরায় বিভিন্ন বয়সী বেশ কয়েকজন নারী বসে আছেন। তারা যে বিভিন্ন আর্থ সামাজিক শ্রেণী থেকে উঠে এসেছেন তা সুস্পষ্ট তাদের পোশাকআচরণ-কথোপকথনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের কথায় জানা যায় তারা আসলে ঐ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন; প্রত্যেকেই নির্যাতিত, ভুক্তোভুগী কোন না কোনভাবে। বাইরের পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ যে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে তাদের কাছে আসছে। কিন্তু ঐ ছোট্ট ঘরে স্থান সংকুলান নিয়ে সবাই বেশ চিন্তিত, কেউ কারও সুবিধা বা জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। মতবিরোধ ও কথা কাটাকাটি তৈরি হয় তাদের মধ্যে। কিন্তু একসময় তারা বুঝতে পারে, বিপদের সময় ঝগড়া করে লাভ নেই, বরং মানিয়ে নিতে হবে ঐ ছোট্ট ঘরেই, কেননা বাইরের পরিস্থিতি এত ভয়ংকর যে সেখানে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে তা তারা জানেনা। তাই নতুন আশ্রয়প্রার্থীকে বরণ করা ছাড়া তাদের কোন গতি নেই।

ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয়। ভারতীয় বিচারালয়গুলোতে ১ লক্ষ ধর্ষণ মামলা পরে আছে। প্রতিদিন গড়ে ৯০টি মামলা বন্ধ করে দেয়া হয় নানা কারণে। প্রতি বছর গড়ে ২০ হাজার কন্যা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। বিচারের হার যদিও বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা ভাল। ভারতে শতকরা ৩২ ভাগ ধর্ষণের বিচার হয় যেখানে বাংলাদেশে মাত্র ৪% এর বিচার কার্যকর হয়। ভারত নারীদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনসহ নানা মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে এসেছে ভারতে নারীর প্রতি নির্যাতনের এই ভয়াবহ চিত্র। নারীর প্রতি নির্যাতনের ভয়াবহতার ক্ষেত্রে ভারতের পাশাপাশি আছে পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত উপমহাদেশীয় দেশগুলোও। যদিও নারী উন্নয়ন ও সমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থা দক্ষিণ এশিয় দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভাল। কিন্তু বাংলাদেশেও গত এক দশকে নারী নির্যাতন বিশেষত নারী-কিশোরী ও কন্যা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার হার বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ যা অত্যন্ত আশংকাজনক। 

দেবী নামের এই ছোট্ট প্রতীকী স্বল্পদৈর্ঘ্য গল্পটি এই প্রহসনটিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যে দেশের ৮০ ভাগ মানুষ নারী দেবতা বা দেবীর পূজা করে সে দেশের মানুষেরাই নারীর প্রতি অমানুষিক নির্যাতনের দিক থেকে পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে। এর চেয়ে আসলে বড় হিপোক্রেসি, ভণ্ডামি আর হতে পারেনা।

পরিশেষে

দেবী কোন একটি বিশেষ দেশ, সমাজ বা কোন নির্দিষ্ট সংস্কৃতির গল্প নয়। দেবী সার্বজনীনভাবে নারীর বর্তমান অবস্থার গল্প। কেননা সব সমাজেই নারীকে মাতৃরূপে কল্পনা করা, অশেষ শ্রদ্ধা করার কথা বলা হয়, সম্মান করার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখা হয়, ধর্ষণ করা হয়, খুন করা হয় এবং তাকে পুরুষের সমান ভাবা হয়না বরং নানাভাবে  অসম্মান ও বৈষম্যের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়।

অথচ নারী ও পুরুষের গুণ ও ক্ষমতার যে ভিন্নতা তা তাদেরকে কারও থেকে কাউকে ছোট বা বড় করেনা। নারী ও পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। নারীও পুরুষের মত বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ, তাই তাকে মানুষ হিসেবে সম মর্যাদা ও শ্রদ্ধা করার চর্চা করতে হবে সব সমাজে। তাহলেই নারীর প্রতি নির্যাতন, বৈষম্য ও অপরাধ কমে আসবে, এমন প্রহসনমূলক পরিস্থিতি তৈরি হবেনা।

তথ্যসূত্রঃ ইউটিউব, থমসন রয়টার্স রিসার্স ফাউন্ডেশন, বিবিসি, এন্ড ডি টিভি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *