follow us at instagram
Monday, April 06, 2020

শরীরে কিভাবে আক্রমণ করে করোনা? কিভাবে ছড়ায়?

আতঙ্কিত না হয়ে কিভাবে করোনাভাইরাস থেকে দূরে থাকা যায় তা জেনে নিতে হবে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/02/Capture.PNG-korona.png

ইতোমধ্যে সবার কমবেশি জানা হয়ে গেছে  করোনাভাইরাসে আক্রান্তের উপসর্গ— জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেটের  মাধ্যমে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশের যারা অবস্থান করে তাদের চোখ-নাক-মুখের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গেই এই অণুকণা কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়। সেখানে স্পাইকের মতো দেখতে করোনাভাইরাসের অণূকণা মানবদেহের কোষে  ঢুকে পড়ে। এই ভাইরাস, কোষে তার অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। যা আশেপাশের কোষগুলোকেও সংক্রমিত করে। কোষগুলি বাধ্য হয় ভুলভাল কাজ করতে যার উপসর্গ হিসেবে দেখা যায় গলা ব্যথা ও শুকনো কাশি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম শেফনার দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই ভাইরাসটি এরপর নিচের দিকে নেমে ব্রঙ্কিওল টিউবে প্রবেশ করে। যখন এটি ফুসফুসে পৌঁছে যায় সেখানকার ঝিল্লিকে সংক্রমিত করে। এটি ফুসফুসের অ্যালভেলি বা থলিগুলোকে ক্ষতি করতে পারে। তখন রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ ও শরীর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিতে ফুসফুসকে আরও কষ্ট করতে হয়।
যদি ফুসফুস ফুলে উঠে তবে সেই ঝিল্লি পার হওয়া অক্সিজেনের জন্য বেশ কষ্টকর। ফুসফুস ফুলে যাওয়া এবং অক্সিজেনের প্রবাহ ব্যাহত হলে সেইসব জায়গা তরল ও মরা কোষে পূর্ণ হয়ে যায়। এসময় তীব্র শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়। অনেককে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়। আর অবস্থা আরও খারাপ হলে, যাকে অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম বলা হয়, যেখানে ফুসফুসে তরল এতোটাই বেড়ে যায় যে, কোনো সহায়তাই আর কাজ করে না। এই পর্যায়ে চলে যাওয়া রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফুসফুসে ঢুকে কোন পথে ছড়ায় ভাইরাস?

শিকাগো স্কুল অব মেডিসিনের প্যাথোলজি বিভাগের অধ্যাপক সু-ইউয়ান জিয়াও চীনের করোনা-আক্রান্ত রোগীদের রিপার্ট পরীক্ষা করেন। তাঁর মতে, ফুসফুসের দুই পা‌শের পেরিফেরিয়াল অঞ্চলে আক্রমণ করে উপরের শ্বাসনালী ও ট্রাকিয়ার দিকে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস।

আইকাহান স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, চীনে অনেক রোগীর প্রাথমিক পর্যায়ে সিটি স্ক্যান করানো হয়েছিল। সিটি স্ক্যানে দেখা যায়, রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ফুসফুসের অংশগুলিতে এক ধরনের ধোঁয়াশার তৈরি হয়। এমনটা বিভিন্ন ধরনের ভাইরাল শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণের জন্যই হয়।

অসুস্থতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অস্বচ্ছ অঞ্চলগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে ও ঘন হতে থাকে।

গবেষক কম্পটন ফিলিপের মতে,মিউকাস মেমব্রেনের পথ ধরেই এই ভাইরাস ছড়ায়। তাই নাক-মুখ দিয়ে ঢুকে তা মিউকাস মেমব্রেন ধরে এগোতে এগোতে পায়ুদ্বার পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। পথে যে কোনও অংশেই ছড়াতে  পারে করোনা। গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সিস্টেমেও এই ভাইরাস হানা দেয়। তখন জ্বর-সর্দি-কাশির সঙ্গে ডায়রিয়া বা বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে এই জীবাণু। করোনাভাইরাস রোগীর আরএনএ ​​এবং মলের নমুনাতেও ধরা পড়েছে এ তথ্য। এছাড়াও এই ভাইরাসের হানার প্রকোপে অস্থিমজ্জা এবং লিভারের মতো অঙ্গগুলিও ফুলে উঠতে পারে। শরীরে এই ভাইরাস ছড়়িয়ে যাওয়া মাত্র শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর সঙ্গে লড়াই শুরু করে। ফলে এর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রদাহযুক্ত অঞ্চলগুলির কিছুটা ক্ষতি করে। ফলে শারীরিক ক্ষতি যে কেবল ভাইরাসের কারণেই হয়, এমন নয়। ক্ষতি কিছুটা হয় নিজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্বারাও।

মস্তিষ্কে এই ভাইরাস ক্ষতি করে কি না তার কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে, গতমাসে জার্নাল অব মেডিকেল ভাইরোলজিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্সের সঙ্গে কোভিড-১৯’র মিল থাকায় নার্ভ সেলের ক্ষতির বিষয়টি একেবারে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।

কেন এই ভাইরাস সবার জন্য মরণঘাতী নয়

নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ ভাগেরই হালকা  উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। আর  ২০ ভাগ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর অনেকটাই  নির্ভর করছে এটি। যারা বয়স্ক ও অন্যান্য জটিল রোগ আক্রান্ত  তাদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।অন্যদিকে যাদের শরীরে আগে থেকে কোনো মারাত্নক রোগ বাসা বাঁধেনি তারা অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশি নিরাপদ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

রোগ বালাই পৃথিবীতে আগেও ছিল,এখনও আছে,ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই বলে তো আর বসে থাকলে চলবে না। একসাথে প্রতিরোধ এবং এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে।আর সেজন্য চাই এই রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা। আতঙ্কিত না হয়ে কিভাবে এই রোগ থেকে দূরে থাকা যায় তা জেনে নিতে হবে।পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অর্থ্যাৎ বার বার হাত ধোঁয়ার ব্যাপারে যে নির্দেশনা আসছে তা মেনে চলতে হবে কারণ এই ভাইরাস সাবান পানির সংস্পর্শে আসলে তার কার্যক্ষমতা হারায়।হাঁচি কাশি দেয়ার সময় টিস্যু অথবা কুনুই দিয়ে বাঁধা প্রদান করতে হবে যাতে করে এর ড্রপলেট না ছড়িয়ে পরে। খাবার দাবারে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্টের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ধূমপান,অ্যালকোহল দূরে রাখতে হবে। প্রতিদিন গোসল এবং প্রচুর পানি পান করতে হবে।খাবার পুরোপুরি সেদ্ধ করে খেতে হবে।

এর পরও যদি কেউ এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হন তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং আইসোলেশন প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে। আসুন সবাই জানি এবং মানি। এতেই আমাদের তথা মানবাজাতির মঙ্গল নিহিত।

সূত্রঃ ডেইলি স্টার, আনন্দ বাজার পত্রিকা(অনলাইন সংস্করণ) 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *