follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

বাংলাদেশের করোনা ভাইরাসের জিন আবিষ্কার বিজ্ঞানী বাবা-মেয়ের

ডঃ সমীর সাহা এবং ডঃ সেঁজুতি সাহার যৌথ গবেষণায় করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার হয়েছে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/01/Untitled-5-5e1f6928a338b.jpg

করোনা ভাইরাসের গতি প্রকৃতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা বেশ গলদঘর্ম একটি টিকা আবিষ্কারের জন্য নজিরবিহীন ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা দেশে দেশে এরই অংশ হিসেবে করোনা ভাইরাস নিয়ে চলছে গবেষণা সারা বিশ্বজুড়েই কভিড১৯ নামের এই করোনা ভাইরাসটি স্প্যানিশ ফ্লু বৈশ্বিক মহামারীর পর সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এখন পর্যন্ত কোভিড১৯ করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মাত্র ছমাসে মৃত্যু বরণ করেছে পৃথিবীজুড়ে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ এই মৃত্যুর মিছিল কমার কোন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না শীঘ্রই 

বাংলাদেশী করোনার জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার

করোনা ভাইরাসের এই প্রজাতিটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেন এত গলদঘর্ম হচ্ছেন  তার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে কোভিড ১৯ অন্য যেকোনো ভাইরাসের চেয়ে দ্রুত গতিতে সহজে ছড়ায় এর জিন পরিবর্তন হয়েছে এপর্যন্ত নয় বার ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং চীনের বিজ্ঞানীরা তাঁদের দেশের মানুষের ভেতর কোভিড ১৯ কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে অর্থাৎ এর জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করেছেন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সুবিধার্থে বাংলাদেশে এবারই প্রথম এই ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স বা বংশগতির ক্রমবিকাশ সূত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা গত মঙ্গলবার ১২ মে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিজ্ঞানী ডঃ সমীর সাহা এবং ডঃ সেঁজুতি সাহার যৌথ গবেষণায় ফলাফল পাওয়া গিয়েছে

আবিষ্কারকরা যা বলছেন

বাংলাদেশে করোনার বিস্তার সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন তাঁরা কোভিড ১৯ এর মত অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল সংক্রমণশীল একটি ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স শনাক্ত করা বেশ কঠিন সেটাই কেবল সম্ভব হল গবেষণা বাকি আছে আরও আগামী সপ্তাহে আরও কয়েকটি জিনোম সিকোয়েন্স শনাক্ত করা হবে

এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি অঞ্চল আবহাওয়া ভেদে বদলে যায় ফলে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মানুষের দেহে ভাইরাসটি কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সংক্রমিত হচ্ছে, সেটাই শনাক্ত করা সহজ হবে এই আবিষ্কারের ফলে এতে বাংলাদেশের মানুষের উপযোগী টিকা তৈরিতেও বাংলাদেশ একদিন সফল হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের এই অণুজীব বিজ্ঞানীরা 

তবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য বৃহৎ গবেষণার জন্য ইতিমধ্যে জমা দেয়া হয়েছে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা (জি আই এস এইড ) নামের একটি জার্মান সরকারের অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে সেখানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ১৮ হাজার করোনা জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে গবেষণার সুবিধার্থে বাংলাদেশের এই জিনোম সিকোয়েন্সটি প্রথম শনাক্ত করার পর সংগৃহীত হয় মূলত গত ১৮ এপ্রিল গত ১১ মে সেটি জি আই এস এইড ডাটাবেজে পাঠানো হয় ১২ মে সেটির স্বীকৃতি মেলে ১৮ এপ্রিলের জিনোম  সিকোয়েন্সটি ডঃ সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে সংগৃহীত হয়েছিল একজন ২২ বছর বয়সী করোনা আক্রান্ত তরুণীর শরীর থেকে

বিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার সংক্রমিতদের থেকে আরও নমুনা সংগ্রহের পরে আরও কিছু জিনোম সিকোয়েন্স শনাক্ত করবেন তাঁরা এতে তাঁরা ভাইরাসটির গতিপ্রকৃতি বুঝতে প্রতিরোধের উপায় খুঁজে বের করতে সক্ষম হবেন বাংলাদেশের সংক্রমিতদের শরীরে পাওয়া কোভিড ১৯ এর জিনোমের সাথে চাইনিজ আমেরিকান কোভিড জিনোমের মিল পাওয়া যায়নি, মিল পাওয়া গিয়েছে ইয়োরোপীয় কোভিড ১৯ জিনোমের বিশেষত সুইডেন, রাশিয়া, শ্রীলংকা, তাইওয়ানের ভাইরাসের সাথে মিল রয়েছে বাংলাদেশী করোনা ভাইরাসের ফলে এভাবেই আরও সুনিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যে নভেল করোনা কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ ঘটেছে ইয়োরোপ থেকে আগত প্রবাসীদের মাধ্যমেই 

বিজ্ঞানী ডঃ সেঁজুতি সাহা করোনা প্রতিরোধে সচেতন করার জন্য সবাইকে বিশ সেকেন্ডের বেশি হাত ধোয়া, বাইরে বের হবার সময় মাস্ক পরিধান করা এবং যথাসম্ভব কম বাইরে বের হওয়া এবং বের হলে সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে পালনের পরামর্শ দেন 

চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ঢাকা ল্যাবে এই গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে এই গবেষণায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, চ্যান জুকারবার্গ বায়োহ্যাব ইনিশিয়েটিভ 

জিনোম সিকোয়েন্স আসলে কি

জিনোম সিকোয়েন্স মানে হল জিনের গঠন শনাক্ত করা একটি ভাইরাসের মধ্যে জিন যেভাবে সাজানো থাকে তাঁর ম্যাপকেই বলা যায় জিনোম সিকোয়েন্স এই ম্যাপ শনাক্ত করতে পারলে সঠিকভাবে বোঝা যাবে কিভাবে ভাইরাসটি পোষকদেহে বেঁচে থাকে এবং নতুন দেহে সংক্রমণ ঘটায় এবং এর গতি প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব হয়, লক্ষণ উপসর্গ দ্রুত চিহ্নিত করা যায়, রোগীর জন্য ব্যবস্থাপত্র তৈরি করা অর্থাৎ চিকিৎসা দেয়া এমনকি ঔষধ নিয়ে গবেষণাও সহজ হয়ে যায় মোটকথা করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় যেকোনো প্রতিরোধ বা নির্মূলমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বপ্রথম করোনার জিন রহস্য উদ্ঘাটনই করতে হবে সবার আগে এখন পরবর্তী ধাপের টেস্টিং প্রক্রিয়া অর্থাৎ টেস্টিং কিট তৈরি, টিকা ইত্যাদি আবিষ্কারও অনেক সহজ হয়ে যাবে নিশ্চিতভাবেই 

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে এর জিনোম সিকোয়েন্স নির্ণয়ের বিকল্প নেই কেননা, বিভিন্ন অঞ্চলের করোনা আক্রান্তদের ভাইরাল স্ট্রেনের পাশাপাশি অঞ্চলের সংক্রমণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করার মাধ্যমেই জানা সম্ভব হয় এই ভাইরাসের কোন ধরণের স্ট্রেন কতটা শক্তিশালী আর মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাসে বদল এলেও করোনা অন্যান্য ভাইরাসের মতই এক সময় পরে আর জিনোম সিকোয়েন্স বদলাতে পারবেনা সময় থেকে ভাইরাসটি দুর্বল হতে শুরু করবে সেই সময়টা ঠিক কখন আসবে সেটাও জানা যাবে জিনোম সিকোয়েন্স থেকে

প্রেরণার নাম অণুজীব বিজ্ঞানী ডঃ সমীর সেঁজুতি সাহা

ডঃ সমীর সাহা আন্তর্জাতিক খ্যাতি মানসম্পন্ন অণুজীববীদ তিনিই চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এর আগে তিনি বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ম্যানেঞ্জাইটিস নিউমোনিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনিই এই দুইটি রোগের টিকা আবিষ্কার করেন এবং তাঁর তাঁর প্রতিষ্ঠানের আওতায় দেশের ৯৮ ভাগ শিশুকে এই টিকার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয় ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিতে তাঁর অবদানের জন্য তিনি ২০১৭ সালে আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রো বায়োলজি পুরষ্কার লাভ করেন কিছুদিন আগে তিনি ইউনেস্কো কার্লোস জে মাইক্রোবায়োলজিতে ফিনলে পুরষ্কার লাভ করেন

শুধু তিনি নন, তাঁর স্ত্রী একজন অণুজীব বিজ্ঞানী কন্যা সেঁজুতি সাহাও মাইক্রোবায়োলজিতে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এখন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর ছেলেও মাইক্রোবায়োলজিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণরত কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ যেন পুরো পরিবারই মাইক্রোবায়োলজি পরিবার তাঁদের অবদানে বিস্মিত খোদ পৃষ্ঠপোষক বিল গেটস বছরের শুরুতে তিনি এই বাবা মেয়েকে নিয়ে লেখেন একটি বিশেষ নোট , একটি অনুষ্ঠানও করেন যেখানে সেঁজুতিকে নির্বাচন করা হয়েছিল তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে বক্তব্য রাখতে সেই নোটে তিনি বাবা মেয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন তাঁরাই সকলের প্রেরণা সমীর সাহার অভ্যাস ছিল কর্মস্থল থেকে ফিরে রাতের খাবারের সময় টেবিলে অণুজীব বিষয়ে কথা বলা ছোট্ট সেঁজুতি সেইসব গল্প থেকেই পেয়েছেন অণুজীব বিজ্ঞানী হবার প্রেরণা বিল গেটস বলেছিলেন, সেই টেবিলে যদি তিনি থাকতে পারতেন 

বাংলাদেশ সারা বিশ্বের তুলনায় বিজ্ঞান গবেষণায় যেভাবে পিছিয়ে রয়েছে তাতে এখন আশা বলতে এই ডঃ সমীর সাহা, ডঃ সেঁজুতি সাহা, ডঃ বীজন কুমার শীল ডঃ কাদরীর মত বিজ্ঞানীরা করোনা প্রতিরোধে তাঁদের অবদান অনেক ফলপ্রসূ হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়

তথ্যসুত্রঃ ডেইলি স্টার, যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ ২৪। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *