follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

পিরিয়ড নারীর মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে যেভাবে প্রভাবিত করে

পিরিয়ডের কারণে মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় চিন্তা ভাবনায় আসে নমনীয়তা ও সূক্ষ্মতা।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/08/Capture.PNG33.png

পিরিয়ড বা মেয়েদের রজঃস্রাব নিয়ে আমাদের দেশে ট্যাবু আর নেতিবাচক ভাবনার অন্ত নেই এখনও এই একুশ শতকে এসেও নারীর রজঃস্রাবের মত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সবাই ডাকেশরীর খারাপনামে শিক্ষিতঅশিক্ষিত ভেদে আমাদের দেশের সবাই এটা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায় ঘরে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বা বন্ধুদের আড্ডায় কোথাও কেউ প্রকাশ্যে এটা নিয়ে কথা বলতে চায় না, ঠাট্টা করে বা এমনভাবে বিষয়টি চেপে যায় যেন এটা কোন লজ্জাজনক বিষয় অথচ, পিরিয়ড বা রজঃস্রাব নারীর শরীরমনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এর প্রভাব বলা যায় সবসময়ই নারীর উপর থাকেই 

কিভাবে?

পিরিয়ড কিভাবে নারীর মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে সবসময় এটা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন চমকপ্রদ সব তথ্য মূলত মানুষের শরীর নিয়ন্ত্রণ করে নানারকম হরমোন হরমোনের প্রভাবে আচার আচরণ কাজ করে শরীর নারী যেহেতু রজঃস্রাব এর মত একটি যন্ত্রণাময় জটিল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর যায়, তাই নারীদের হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রণের মাত্রা আরও বেশি  

কোন শান্ত মেয়েকে হুট করে কিছুটা অকারণে খিটখিটে আচরণ করতে দেখেছেন? কিংবা বাচ্চার সাধারণ ভুলে বেশি বকা দিতে দেখেছেন কোন মাকে? আবার স্ত্রী স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে দেখলে মাঝে মাঝে অবাক লাগে, তাইনা? এসবই হরমোন এবং পিরিয়ডের অনিবার্য প্রভাব

হরমোন এবং পিরিয়ড

পিরিয়ড নারীর জন্য এই আধুনিক যুগেও  যথেষ্ট স্ট্রেসফুল একটি অভিজ্ঞতা স্যানিটারি ন্যাপকিন আবিষ্কৃত সুলভ হবার আগে মাসের এই সময়টা নারীদেরকে ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হত এখন সেটা না থাকলেও নারী শরীরের ভেতর পিরিয়ডের সময় যে ভাঙ্গা গড়ার খেলা চলে তা নারীর মাথার চুল থেকে পায়ের নখের আগা পর্যন্ত প্রভাবিত হয় সেইসাথে প্রভাবিত করতে থাকে তাঁদের আচার আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে এবং সেটা আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক মনে হলেও অনেকটা ইতিবাচক বেশ কিছু দিক থেকে 

কানাডার কিউবেক এর কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়েইন ব্রেক বলেন,

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের যৌনতা বিষয়ক হরমোন ইস্ট্রোজেন প্রজেস্টোরেন পুরোপুরি স্মৃতি ভ্রম ঘটায় না, বরং একটি নির্দিষ্ট স্মৃতি বা কৌশলকে গুরুত্ব দেয়”।

এই গবেষণায় পাওয়া যাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, যাদের পিরিয়ড চলছিল মানে জরায়ু থেকে ডিম্বাণু বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা মৌখিক স্মৃতি পরীক্ষায় ভাল করেছে আর যারা পিরিয়ডের সময়ের দু এক দিন আগে ছিল, তারা রাস্তা খুঁজে পাওয়ার পরীক্ষায় ভাল করেছে এ থেকে বোঝা যায় শরীরে ইস্ট্রোজেন প্রজেস্টোরেন হরমোনের মাত্রা তাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করে আর পিরিয়ডের সময় নারীর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়

কোন অভ্যাস পরিবর্তনে সাফল্য

কোন অভ্যাস পরিবর্তন করাটা বেশ কঠিন কারণ কোন অভ্যাস গড়ে ওঠে মূলত মস্তিষ্কের ডোপামিন ক্ষরণের ফলে আর ডোপামিন হল মানুষের আনন্দের কারণ তাই কোন অভ্যাস ছাড়তে হলে ডোপামিনের ক্ষরণ নির্দিষ্ট কারণে আগে বন্ধ করতে হবে পিরিয়ডের ভিত্তিতে নারীর একমাস সময়কালকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায় যেমন প্রি ওভ্যুলেটরি বা ফলিক্যুলার পর্ব, প্রি মেন্সট্রুয়াল পর্ব অভ্যাস পরিবর্তনে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি পারদর্শী কেননা, যদি কোন নারী কোন অভ্যাস পরিবর্তন করতে চায়, গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী প্রি ওভ্যুলেটরি বা ফলিক্যুলার সময়ে চেষ্টা করেছেন তারা বদ অভ্যাস পরিবর্তনে বেশি সফল হয়েছেন 

ধরা যাক, ধূমপানের বিষয়টি ধূমপানে পুরুষের চেয়ে নারী শরীর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরুষের চেয়ে নারীদের ধূমপান ছাড়তেও বেশি কষ্ট করতে হয় কিন্তু তারা যদি প্রি মেন্সট্রুয়াল সময়ের পরিবর্তে ফলিক্যুলার সময়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করে, তাহলে পুরুষদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি ধূমপান বর্জন করতে সফল হতে পারবেন

স্বপ্নের উপর পিরিয়ডের প্রভাব

ঘুমানোর সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাব ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলে তা অনেক সময় নারীদের বেশি মনে থাকে এর মানে হল, তারা প্রি মেন্সট্রুয়াল বা প্রি ওভ্যুলেটরি পর্বে রয়েছেন সাধারণত প্রি মেন্সট্র্যুয়াল পর্বে নারীদের স্বপ্নগুলো বেশি জটিল দীর্ঘ হয়ে থাকে কেননা, এসময় প্রচুর প্রজেস্টেরন ইস্ট্রোজেন হরমোনের ক্ষরণ ঘটে প্রি মেন্সট্রুয়াল পর্বে নারীদের প্রজেস্টরেন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাওয়ায় আচরণে মেজাজের অধিক তারতম্য, দুশ্চিন্তা আগ্রাসী মনোভাব বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের কগনিটিভ ফাংশন বৃদ্ধি পায়

যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে পিরিয়ড

কোন ব্যক্তির, বিশেষত নারীদের যোগাযোগ দক্ষতা নির্ভর করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের উপর ইস্ট্রোজেন হরমোন মস্তিষ্কের দুই অংশকে প্রভাবিত করেহিপোক্যাম্পাস অ্যামিগডালা হিপোক্যাম্পাসে সংরক্ষিত থাকে স্মৃতি মানুষ বিভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে এই অংশে স্মৃতি জমিয়ে রাখে এসব স্মৃতির সাথে সমন্ময় করে মানুষ বুঝতে পারে কাদের সাথে মিশতে হবে এবং অন্যদের সাথে কি ধরণের আচরণ করতে হবে এবং অন্যদের ভাষা মনোভাবও বোঝার চেষ্টা করে প্রতি মাসে যখন পিরিয়ড হয়, তখন ইস্ট্রোজেন এর ক্ষরণ বেড়ে যাবার ফলে হিপোক্যাম্পাসের আয়তন কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অংশ সহায়তা করে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবেগানুভূতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিকূল পরিবেশে বা কঠিন সময়ে লড়াই করা, কৌশল প্রয়োগ, একাধিক বিষয়ের ভেতর যেকোনো একটি বেছে নেয়া, সংশয়, ভয় ইত্যাদি অ্যামিগডালার মাধ্যমেই গৃহীত হয় ইস্ট্রোজেনের তারতম্যের কারণে কোন নারী আরেকজন ভীত মানুষকে দেখে ভয় পাবে কিনা তা নির্ধারিত হয় ইস্ট্রোজেনের অতিরিক্ত ক্ষরণ নারীকে মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কারো প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল করে তোলে তাই বলা যায়, যাদের ইস্ট্রোজেন হরমোন কম উৎপাদিত হয়, তাঁদের যোগাযোগ দক্ষতা কম তুলনামূলকভাবে

পরিশেষে বলা যায়, আবেগকে প্রক্রিয়াজাত করে নারীরা মস্তিষ্কের ডান বাম উভয় অংশ ব্যবহার করে আরে পিরিয়ডের কারণে মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় তাঁদের চিন্তা ভাবনায় আসে নমনীয়তা সূক্ষ্মতা ফলে পিরিয়ডের কারণে নারীরা সাময়িক যন্ত্রণা অস্বস্তিতে ভুগলেও আসলে এটা তাঁদের জন্য আশীর্বাদফলে পিরিয়ড বা রজঃস্রাব নিয়ে হীনমন্যতা লজ্জায় ভোগার কোন কারণ তো নেইই বরং এই সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন নারীরা  

তথ্যসূত্রঃ ফোর্বস, প্রথম আলো, সমকাল, রোর বিডি। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *