follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

পুরুষদের গৃহস্থালি কাজ নিয়ে ঠাট্টা আমাদের কি বার্তা দেয়?

গৃহস্থালি কাজ নিয়ে মজা করা, বিদ্রূপ করা, হিউমার করা চলে না। গৃহস্থালি কাজগুলোর দায়িত্ব উভয়ের।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/06/5e92126a3000002903153f1b.jpeg
Image Source: huffingtonpost.in

শিশুদের ব্যাঙ নিয়ে খেলার গল্পটি মনে আছে? এক আধা শুকানো ছোট্ট ডোবায় বেশ কিছু ব্যাঙ ছিল। ছোট ছেলেদের দল তাঁদের দিকে ঢিল ছুড়ে দিলে তারা লাফাতে শুরু করত। যেন তারা মজা পেয়ে লাফাচ্ছে। ছেলেরাও তখন খুব মজা পেত। তাদের কাছে সেটাই ছিল এক মজার খেলা। কিন্তু ব্যাঙগুলোর কাছে সেটা ছিল কি? কখনও কি ঐ ছেলেগুলো ভাবতে পারবে যদি তাদের না বোঝানো হয়? পারবেনা। ব্যাঙগুলো ঢিল এড়ানোর জন্য, মানে বাঁচার জন্য ওভাবে লাফাতো। তারা ঐ ডোবা ছেড়ে যেত না, শুধু লাফিয়ে স্থান পরিবর্তন করতো। ছেলেগুলো তাতেই মজা পেত। ছেলেগুলোর কাছে যা ছিল মজার খেলা, ব্যাঙগুলোর কাছে তা-ই জীবন বাঁচানোর উপায়। ফলে আসলেও ওটা ভাল আনন্দের উৎস বা মজা কিনা সেই প্রশ্ন সহসাই ওঠে। না, ওটা অবশ্যই কোন মজা পাবার মত কোন কাজ নয়।

লকডাউন শুরু হবার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহার বেড়ে গেছে অনেক। অফিস না থাকায় পুরুষেরাও যখন দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা ঘরে, তখন মানুষ মন ভাল করার জন্য, কিছুটা আনন্দের জন্য নানা বিষয় নিয়ে ব্যাঙ্গ রসাত্মক ভিডিও, গ্রাফিক্স বানাতে লাগল। তো সেই মজার জোক বা ভিডিওগুলোর বেশিরভাগের বিষয় হল গৃহস্থালি কাজ কর্মে পুরুষের অংশগ্রহণ। 

পুরুষতান্ত্রিক আচরণ, জীবন যাপন ও এধরণের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজের জন্য অভিশাপ। আমাদের সমাজের সমস্ত পশ্চাৎপদতার পেছনে এর জোরালো অবদান কোনভাবে অস্বীকার করা সম্ভব না। পুরুষতান্ত্রিক আচরণের অংশ হল নারী বিষয়ক সবকিছুকে লঘুভাবে দেখা। সমস্যা যখন গভীর ও ভয়ংকর এবং সমাজের বেশিরভাগ মানুষের বোঝার অগম্য তখন চিহ্নিতকৃত সমস্যাকে লঘুভাবে উপস্থাপনের কোন সুযোগ নেই।

লিঙ্গ বৈষম্য এবং পুরুষতান্ত্রিকতাও এমন সমস্যা যাকে নিয়ে আসলে মজা করার কোন সুযোগ নেই। 

কোন মানুষের যখন ক্যান্সার হয় তখন তাঁর জীবন নিয়ে অন্যদের মজা করাটা কতটা মানবিক? ধর্ষণ, নারীর জননাঙ্গ, যৌনাচারণের পাশাপাশি পুরুষের গৃহস্থালি বিষয় নিয়ে মজা করাটাও তেমনি অমানবিক ও পুরুষতান্ত্রিক আচরণ। কারণ, এই জোকস বা ব্যাঙ্গ রসাত্মক ভিডিওগুলো কিছু বার্তা আমাদের সমাজকে দেয় পরোক্ষভাবে। যেমনঃ  

পুরুষ ঘরের কাজ পারেনা, 

কারণ তারা কোনদিনও করে অভ্যস্ত না,

পুরুষকে ঘরের কাজে মানায় না,

ঘরের কাজ মূলত নারীদের,

নারীদেরই ঘরের কাজে মানায়,

নারীরা ঘরের কাজ করতে বাধ্য,

ঘরের কাজের দায়িত্ব নারীদের, পুরুষের দায়িত্ব বাইরে সামলানো,

বাইরের দায়িত্বে থাকা নারীদের ঘর সামলানোও দায়িত্ব

এসব বার্তা যখন কারও মাথায় আগে থেকে থাকে বা ঢোকে তখন ঐ ভিডিওতে সহজ গৃহস্থালি কাজ করতে গিয়ে ঝামেলা পাকানো পুরুষের প্রতি স্নেহসুলভ প্রশ্রয় তৈরি হয়। তার ভুলগুলো তখন হাস্যকর মনে হয়। সে ভুল করলেই তখন মজা লাগে।  

কিন্তু আসলে কি ? কাজের কোন লিঙ্গ হয়না। প্রতিটি মানুষই ছোটবেলা থেকে যেভাবে শেখে নিজের হাত দিয়ে খাওয়া, নিজে নিজে জামা কাপড় পড়া, নিজে বাথরুম করা তেমনি ঘরের কাজগুলো যেমন থালাবাসন ধোয়া, ঘর মোছা, ঝাড়ু দেয়া, রান্না করা ইত্যাদি কাজও তার শেখা বা উচিৎ বা নিয়মিত করা উচিৎ। কেউ যখন বিয়ে করে, তখন এসব কাজের আয়তনও যেমন একটু বাড়ে তেমনি সহায়তা পাবার সুযোগও তৈরি হয়। তখন দরকার এসব কাজ ভাগ করে নেবার। 

প্রতিটি মানুষেরই দুই ধরণের জীবন আছে। একটি একান্ত ব্যক্তি জীবন আরেকটি সামাজিক জীবন। নারীর সামাজিক জীবন থাকতে পারেনা, থাকা উচিৎ না এধরণের অমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কাজের এমন অর্থহীন বিভাজন তৈরি হয়।এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেই কেবল মনে হয়, নারী করবে ঘরের কাজ, পুরুষ করবে বাইরের কাজ। এই বিভাজন তখন পুরুষকে এটা ভাবতেও বাধ্য করে নারীর এই ঘরের কাজ খুবই ছোট, নারীও তাই দুর্বল, কারণ তারা এসব ছোট, মূল্যহীন, সহজ কাজ করেই জীবন পার করে দিতে পারে।

কিছুদিন আগে ‘থাপ্পড়’ নামে একটি হিন্দি ভাষার চলচিত্র খুব প্রশংসিত হয়েছে। ছবির গল্পে দেখা গেছে, একজন আন্তরিক ও পরিশ্রমী গৃহবধূকে সবার সামনে থাপ্পড় দেয় তার স্বামী। সেজন্য বিচ্ছেদ দাবি করে তার স্ত্রী, স্বামী বিক্রম তখন অবাক হয়ে জানতে চায়, কি এমন হয়েছে যে শুধু একটি থাপ্পড়ের কারণে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে? বিক্রমের স্ত্রী তাকে কিছু না বললেও নিজেকে বলে, দর্শককে বলে, এই থাপ্পড়ের আগে প্রতিদিন সে আন্তরিকতার সাথে সংসারের সব কাজ করে গেছে। নিজের সময়, মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে সংসারকে রেখেছে ত্রুটিহীন। তার সমস্ত অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তার সংসার, স্বামীর কেরিয়ার, স্বামীর সুবিধা-অসুবিধা। কিন্তু সেসবই যেন তার কাছে অনেক আগে থেকে প্রত্যাশিত। পুরো সমাজই যেন তার কাছ থেকে শুধু এটাই প্রত্যাশা করে। আর কিছু যেন তার স্বামীও তার কাছ থেকে আশা করেনা। তার নিজস্ব কোন আশা আকাঙ্ক্ষা, কাজ , সাফারিং এর কোন মূল্য নেই কারও কাছে। এমনকি তার নিজের কাছেও আর নেই। তাই সে নিজের শতভাগ ঢেলে দিয়েছিল। কিন্তু শতভাগ দেবার পরেও তাঁকে সেই সমাজে সবার সামনে থাপ্পড় খেতে হল। এবং থাপ্পড় খাবার পর সেটাকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে এটাই যেন শতকণ্ঠে চাইছে সমাজ, তার স্বামীও । এই যে একতরফাভাবে আত্ম মর্যাদা বিসর্জনের চিত্র , এটা কি স্বাভাবিক? অনেকে হয়তো বলবে, এর বিনিময়ে সে কি কিছু পাচ্ছেনা? সে পাচ্ছে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা, সে পাচ্ছে স্বামীর সবকিছু। কিন্তু এই যে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা এসবতো সে নিজে অর্থ উপার্জন করেও পেতে পারত তার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে যদি সে সুযোগ পেত বা ইচ্ছে করত। তাহলে সে সেটা না করে শুধু সংসার করল কেন? প্রশ্ন এখানেই। সে হয়তো ভালবেসে কাজটা করেছে। কিন্তু সে ভালবাসায়ও গলদ তৈরি হয় স্বামীর পক্ষ থেকে যখন স্বামী বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যথেষ্ট মনোযোগ, মর্যাদা এবং শ্রদ্ধা না দেয় এবং সেটা হওয়াই অনিবার্য । ফলে সাংসারিক কাজ একতরফাভাবে শুধু নারীদের করার আবহমান যে সংস্কৃতি বা নীতি তা সম্পূর্ণ উদ্ভট, ত্রুটিপূর্ণ, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা উদ্ভূত এবং পশ্চাৎপদ।    

এই ছবিতে একটি দৃশ্যে দেখা যায়, বিক্রমের স্ত্রী চলে যাবার পর বিক্রম সকালে চা করতে যায় ঘুম থেকে উঠে যা আগে তার স্ত্রী করত। সে চা করতে গিয়ে চিনি-চাপাতা কিছুই খুঁজে না পেয়ে মেজাজ খারাপ করে ফেলে। একসময় সে চা-পাতা ছুড়ে ফেলে, হাত পুড়িয়ে ফেলে। এই দৃশ্যে হয়তো বিক্রমের প্রতি অনেকের সহানুভূতি তৈরি হবে। কিন্তু এই দৃশ্যের গুরুত্ব অন্য খানে। সামান্য চা বানাতেও যে মনোযোগ আর যত্ন দরকার সেই মানসিক পরিস্থিতিও তার নেই। স্ত্রী চলে যাবার পর সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, কিন্তু পারেনা আর। কারণ তার স্ত্রী এতদিন যে কাজগুলো করতো, সেগুলো সে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ বা স্বাভাবিক ও আবহমান বলে ধরে নিয়েছিল। এসব কাজের প্রতি তেমন গুরুত্ব বা শ্রদ্ধা তার ছিল না, ফলে মানুষটার প্রতিও শ্রদ্ধা কমে গিয়েছিল। বিক্রমের এই যে মানসিক অবস্থা, এটাই আমাদের সমাজের বেশিরভাগের মানসিকতা, পুরুষতান্ত্রিকতা। 

আবার যেসব নারীরা কর্মজীবী তাদের ভুগতে হয় দ্বিগুণ হারে। তারা বাইরে অফিস করে এসে যখন ঘর সামলান, ঘরের কাজ করেন, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মন রক্ষা করে চলেন তখন তারা পান সুপার হিউম্যান/ওম্যান উপাধি। এই যে অতিরিক্ত কাজের চাপ এতে তার মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা অনেক। তাছাড়া, নারীর এমন ভূমিকা আমাদের উত্তর প্রজন্মকেও একই ভুল বার্তাই দেয়। 

ফলে গৃহস্থালি কাজ নিয়ে মজা করা, বিদ্রূপ করা, হিউমার করা চলে না। গৃহস্থালি কাজগুলোর দায়িত্ব উভয়ের। সেই দায়িত্বের কোন বয়স নেই, সম্পর্কের ভেদ নেই, লিঙ্গের কোন ভেদ নেই। সবাইকেই সবধরনের কাজ করতে হবে নিজেদের তাগিদে, সমাজ ও পৃথিবী বাঁচানোর তাগিদে। পুরুষের কাজ যেমন শুধু বাইরে না এবং শুধু উপার্জন করা নয়, তেমনি নারীর কাজও শুধু ঘরের কাজ করা নয়। মোটকথা, এই কথাই সর্বাগ্রে মাথায় রাখতে হবে, কাজের কোন লিঙ্গ নেই। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *