follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

আউটসোর্সিং হতে পারে মেয়েদের বেকারত্বের সমাধান

আউটসোর্সিং ওয়েবসাইটে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে কর্মসংস্থানের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/09/shutterstock_696670858-1280x853.jpg

বিশ্বজুড়ে করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি, বাড়ছে বেকারত্ব। ত্রিশের দশকের মহামন্দার পর পুরো বিশ্বে এবারের মত প্রথম আবার অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে। সব দেশেই বেকারত্বের হার রেকর্ড ভাংছে প্রতি সপ্তাহেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জার্মানীসহ ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও আছড়ে পড়ছে মন্দার ঢেউ। ইতিমধ্যে ইয়োরোপ থেকে দুই লাখের বেশি প্রবাসী ফিরে এসেছেন বাংলাদেশে, তাঁদের অনেকেরই চাকরি অনিশ্চিত অবস্থায় আছে। সৌদি আরব সহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রবাসী শ্রমিকরা ফিরছেন। দেশের ভেতর কাজ হারিয়েছেন ইতিমধ্যে লক্ষাধিক নর-নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণেই মূলত ভুক্তোভুগী হতে হচ্ছে বিপুল সংখ্যক দক্ষ পেশাজীবী ও শ্রমিককে। 

নারী বেকারের সংখ্যা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। যদিও বাইরের কাজ হারানো নারীদের ঘরে ফিরেও কাজ করতে হয় পারিশ্রমিকবিহীনভাবে। কিন্তু পারিশ্রমিক যুক্ত কাজ হারানোর ফলে শিক্ষিত নারীরা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হচ্ছেন। এমনিতেই মহামারীর সময় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল থাকার কারণে খুবই নাজুক পরিস্থিতিতে ও ঝুঁকিতে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। তাই নারীরা কিভাবে এই লক ডাউনে কর্ম সংস্থান করতে পারেন এবং দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে পারেন,তা ভাবার সময় এসেছে। 

আউটসোর্সিং হতে পারে এর সমাধান। আউটসোর্সিং বলতে কোন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান মালিক যখন খরচ কমানোর জন্য বা সুবিধার জন্য নিজের প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে পণ্য বা শ্রম কিনে চাহিদা মেটান, তখন পণ্য/শ্রমকে আউট সোর্স করা বোঝায়। সেই হিসেবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পগুলোও কিন্তু এক ধরণের আউটসোর্সিং ই করছে। তবে অনলাইন আউটসোর্সিং ভিন্ন বিষয়। আমেরিকা ও ইয়োরোপের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দক্ষ পেশাজীবী ও ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেন, কেননা এতে খরচ কম পড়ে। যে কাজ ১০০ ডলার প্রয়োজন সম্পন্ন করতে সে কাজ হয়তো ২০-৫০ ডলারের বাজেটেই করে ফেলা সম্ভব হয়। আবার যারা ফ্রিল্যান্সার তাদের পারিশ্রমিক ডলার মাল্টিপ্লাই হয়ে টাকায় পরিণত হয় বলে সেটা যথেষ্ট সন্তোষজনক হয়।  বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান করেছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এর মধ্যে ৫ লক্ষ মাসিক ভিত্তিতে কাজ করছেন। ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাও কিন্তু কম না। বরং অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই বেশি পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সফল নারী ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা কিন্তু কম না দেশে।                                                                                                                 

যেসব কাজের চাহিদা বেশি

আউটসোর্সিং এ প্রথমে যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা এগিয়ে আছেন এমন ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে গ্রাফিক্স ডিজাইন, লোগো ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, অ্যানিমেশন, ওয়েব ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর্টিকেল রাইটিংং‌ ট্রান্সলেশন, কপি-রাইটিং, ই বুক রাইটিং ইত্যাদি। এসব কাজে দক্ষরা তুলনামূলক দ্রুত কাজ পেয়ে যান। 

যে ধরণের দক্ষতা প্রয়োজন হয়

অনলাইন আউটসোর্সিং এর একটি বড় সুবিধা হল, এটা যেকোনো ইন্টারনেটের লাইন যুক্ত স্থানে বসেই করা যায়। কোন ফর্মাল অফিস সেট আপের দরকার পড়েনা। শুধু একটি ইন্টারনেট যুক্ত কম্পিউটার আর নিজের দক্ষতাই এর মূল পুঁজি। এছাড়া এতে কাজ পাবার জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্রেরও প্রয়োজন নেই। একে বলা যায় ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কর্ম সংস্থান প্লাটফরম। এখানে অভিজ্ঞতা ও কাজের প্রমাণই সব কিছু। 

১। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাঁদের কাজ থেকে কাজের ফ্রি স্যাম্পল বা নমুনা চাইতে পারে এমপ্লয়ার। সেক্ষেত্রে যে কাজে দক্ষতা সেই কাজের ফ্রি নমুনা প্রস্তুত করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

২। শুদ্ধ ইংরেজি বলা ও লেখার দক্ষতা। যেহেতু অনলাইন আউটসোর্সিং আন্তর্জাতিক মার্কেটে করতে হবে, অতএব, ইংরেজিতে অবিরত কথা বলা ও লেখার দক্ষতা থাকতেই হবে। অফিসিয়াল মেইল লিখতে জানাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৩। দ্রুত ও সঠিক সময়ে সারা দিতে হবে। যেহেতু আমেরিকা ইয়োরোপের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সময়ের নানারকম পার্থক্য আছে, তাই তাঁদের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাজগুলো করতে হবে। একারণে সময়ের হিসেব রেখে যে যত দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে পারে এবং দ্রুততার সাথে সারা দিতে পারে তাঁর চাহিদা তত বেশি। 

৪। আউটসোর্সিং করে টাকা আয় করা যায় এটা শুনেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কোন লাভ নেই। আউটসোর্সিং করতে হলে আগে চাহিদা মাফিক বিষয়গুলোর মধ্যে কোন একটি শিখতে হবে খুব ভালভাবে। দক্ষতা তৈরি ও উৎকর্ষতা লাভ করতে হবে।  আউটসোর্সিং ভাল করতে হলে নিজের দক্ষতাই শেষ কথা। এখানে প্রবল প্রতিযোগিতা ও দক্ষতার প্রমাণ অনবরত দিতে পারলেই একমাত্র সফল হওয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রচুর ধৈর্য ও গভীর অভিনিবেশ। যে যত বেশি নিজের দক্ষতাকে ঝালাই করে আপডেটেড থাকতে পারবে, মার্কেটে তাঁর তত বেশি চাহিদা তৈরি হবে পেশাজীবী হিসেবে। ধরুন কেউ যদি গ্রাফিক্স ডিজাইনিং পারে, তাকে অবশ্যই ঐ বিষয়ে দক্ষ হতে হবে,  কাজ সংক্রান্ত সফটওয়্যারের সর্বশেষ ভার্সনেও তাঁর দক্ষতা তৈরি করতে হবে। মোটকথা প্রতিদিন শিখতে হবে এবং প্রয়োগ করতে হবে।

৫। বিশেষায়িত জ্ঞান বা কোন এক বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ধরুন, আপনি ভাল ইংরেজি জানেন। তাই আপনি আর্টিকেল লিখতে পারেন চাইলে। আবার আপনি ওয়ার্ড প্রেস ডিজাইনও ভালই পারেন। যেহেতু আর্টিকেল লিখতে জানেন তাই ডিজিটাল মার্কেটিংটাও শিখে নিয়েছিলেন। এখন আপনি কোনটা করবেন? যেটা সামনে আসবে সেটাতেই কি আবেদন/বিড করবেন একাধিক বিষয়ে দক্ষতা আছে বলে নাকি কোন এক বিষয়ে আবেদন করবেন। পেশাজীবী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে আপনার নিশ্চয়ই কোন এক বিষয়ে আবেদন করা উচিৎ। কেননা, আপনি কোন একটি বিষয় নিয়মিত অনুশীলন করায় যে ফল পাবেন, কয়েকটি বিষয় একই সাথে অনুশীলন করে একই ফল পাবেন না। মনোযোগ বিভাজিত হবে। ধরুন আপনি যদি লেখালেখিতে মনোযোগ দিয়ে শুধু সে বিষয়ের কাজগুলোতে বিড করেন এবং কাজ পান, সেক্ষেত্রে যেহেতু আপনার ডিজিটাল  মার্কেটিং জ্ঞান আছেন, এসইও ফ্রেন্ডলি কি ওয়ার্ড কি হতে পারে জানেন, টার্গেট অডিয়েন্স সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা আছে, সেক্ষেত্রে আপনার আর্টিকেল রাইটিং খুব ভাল হবে। আর নিজের প্রোফাইল ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন ওয়েব ডিজাইন জ্ঞান কাজে লাগিয়ে। এবং সেখানে স্যাম্পল হিসেবে রাখতে পারেন নিজের লেখা আর্টিকেল। এভাবে নিজের সব দক্ষতা একত্রীত করে কোন এক বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে এক্সপার্ট লেভেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এতে দ্রুত কাজ পাওয়ার সাথে সাথে সাফল্যের হারও বাড়বে।

৬। ভাল কভার লেটার লিখতে জানা অপরিহার্য। দক্ষতা থাকলেই শুধু হয়না, ভাল কভার লেটার লেখা শিখতে হবে। অনেক সময় প্রচুর কাজে অ্যাপ্লাই করেও মাসের পর মাস অনেকে কোন কাজ পায় না। এমপ্লয়াররা কিন্তু লম্বা কভার লেটার একদম পছন্দ করেন না। কভার লেটার ১৫০-২০০ ওয়ার্ডের মধ্যে রাখতে পারলে খুব ভাল হয়। প্রতিটি কাজে একই কভার লেটার পাঠানো যাবেনা। কাজের রিকোয়্যারমেন্ট চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী পয়েন্ট আকারে লিখতে হবে আপনি কি কি তাকে কতটুকু সময়ের মধ্যে ডেলিভারি করতে পারবেন। খুবই সুনির্দিষ্ট হতে হবে শব্দ ও বাক্য গঠন। কোন অতিরিক্ত শব্দ ও বাক্য ব্যবহার না করাই ভাল। তবে আবার সৌজন্যসূচক বাক্য বা শব্দ চয়ন যাতে বাদ না পরে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। কভার লেটারে কোন আবেগী, ব্যক্তিগত বা অতিরিক্ত বাক্য লেখা ঠিক নয়।

যেসব অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজ পেতে পারেন

১। আপ ওয়ার্ক (Upwork.com)

২। টপটাল (Toptal.com)

৩। ফ্রিল্যান্সার (Freelancer.com)

৪। কলেজ রিক্রুটার (College Recruiter)

৫। গুরু (Guru.com)

৬। গেটাকোডার (Getacoder.com)

আউটসোর্সিং ওয়েবসাইটে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে কর্মসংস্থানের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে। লকডাউনের এই বেকারত্বের দিনগুলোতে মনোযোগ ও দৃঢ় প্রত্যয় নিইয়ে লেগে থাকতে পারলে কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া খুবই সম্ভব। সহজে হতাশ না হয়ে এবং কর্মহীন অলস সময় না পার করে বরং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের মধ্যে থাকলেই সমস্যা সমাধান সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো, যুগান্তর, টেক টিউন্স 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *