follow us at instagram
Tuesday, August 11, 2020

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

আমাদের দেশে নারী অধিকার ও নারী শিক্ষা সবসময়ই এক অনবদ্য বিতর্কের বিষয়।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/06/image.jpg
Image Source: anandabazar.com

কলকাতার এক বনেদী বাড়ির বড় কর্তা কেবলই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। স্ত্রী-সন্তান দাস-দাসীরা কান্নায় ভেঙে পড়লো। শিয়রে ডাক্তার পালস্ দেখে ঘোষণা করলেন মৃত্যু সংবাদটা। তিনি কিন্তু নড়লেন না, অবিচল ভঙ্গিতে শুকনো মুখে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। এত বছরের সঙ্গী, মহীরুহের মত যিনি ছায়া দিয়ে গেছে তার সমস্ত সংগ্রামমুখর জীবন জুড়ে, তার কাছ থেকে তিনি উঠে যেতে পারছেন না, আবার অন্যদের মত সহসা কাঁদতেও পারছেন না। চিকিৎসার ভার যে তার উপরেই ছিল! অঙ্গহানীর মত যন্ত্রণা নিয়ে বসে রইলেন তিনি। সকাল পেরিয়ে বিকেল হল। ২য় স্ত্রী হিসেবে দাহ করার সব ধর্মীয় কর্তব্যকর্মও তিনি সমাধা করলেন। এমন সময় কলকাতার এক জমিদার বাড়ি থেকে প্রসব করানোর জন্য ‘কল’ এলো। সকালের স্বামীহারা চিকিৎসক বিকেলে তাঁর ব্যাগপত্র নিয়ে সেখানে রওনা হলেন। হতবাক ও অসন্তুষ্ট আত্মীয়রা রে রে করে উঠলে তিনি বললেন, ‘‘যে গেছে সে তো আর ফিরবে না, যে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসছে তাকে আনতে সাহায্য করতে হবে যে!”

এই অসম সাহসী দৃঢ়চেতা চিকিৎসক হলে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।

আমাদের দেশে নারী অধিকার ও নারী শিক্ষা সবসময়ই এক অনবদ্য বিতর্কের বিষয়। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘরে-বাইরে সর্ব স্তরে নারীদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করে যেতে হয়। এই বাস্তবতায় সংসার ছাড়া অন্য কোন পেশায় কাজ করা, আর্থিক, সামাজিকভাবে স্বাধীন হওয়া এখনো এদেশীয় বেশিরভাগ নারীদের কাছে স্বপ্নের অতীত। তবুও এমন স্বপ্ন  পূরণের আশার আলো দেখাতে হাতেগোনা যে কজন সাহসী নারী এগিয়ে এসেছিলেন তারমধ্যে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী অন্যতম।

কে ছিলেন এই কাদম্বিনী গাঙ্গুলী?

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, এক অসামান্য মহিয়সী নারী, যিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দুই জন নারী গ্রাজুয়েটের একজন এবং উপমহাদেশের প্রথম নারী চিকিৎসক। ভাগলপুরের আধুনিক ভাবধারায় প্রভাবিত পরিবারে ১৮৬১ সালের ১৮ই জুলাই জন্মগ্রহন করেন। বাবা ব্রজকিশোর বসু পেশায় শিক্ষক হলেও ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী। ঘরে বইতো উদারচেতা দর্শনের হাওয়া। নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত কাদম্বিনী ১৮৭৩ সালে ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে স্কুলটি ১৮৮৭ সালে বেথুন স্কুলের সাথে একাত্ম হয়। বেথুন স্কুল থেকে কাদম্বিনীই ছিলেন প্রথম এন্ট্রান্স অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকায় বসা একমাত্র নারী। পরীক্ষায় মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ না পেলেও সমস্ত নারীশিক্ষা সমালোচকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। খোদ লর্ড লিটন তাঁর প্রশংসা করেছিলেন।  তাঁর  সাফল্যের মাধ্যমেই স্কুলটি বেথুন কলেজ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল। কাদম্বিনী প্রাইভেটে এন্ট্রান্স দিয়ে পাশ করা আরো এক নারী, চন্দ্রমুখী বসুর সাথে ১৮৭৯ সালে এফএ পাশ করেন এবং তাঁদের যুগ্ম সাফল্য বেথুন কলেজে বিএ পড়ানোর দরজা খুলে দেয়। চন্দ্রমুখী পড়ার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পলিটিক্যাল ইকনমি আর কাদম্বিনী গণিত। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে ইতিহাস গ’ড়ে বিএ পাশ করেন দেশের প্রথম দুই মহিলা গ্র্যাজুয়েট। এরপর কাদম্বিনী সেসময়কার ব্রিটিশ শাসনামলে নারীদের  জন্য এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ স্বরূপ চিকিৎসক হওয়ার ব্রত নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। 

 

দুঃসাহসী জীবনের সফরসঙ্গী – দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী 

শুধু শিক্ষাজীবন নয় ব্যক্তিজীবনেও কাদম্বিনী বার বার সমাজের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেছিলেন। ১৮৮৩ সালের ১২ই জুন তিনি ব্রাহ্ম সমাজে নারীমুক্তি আন্দোলনের আরেক পুরোধা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিয়ে করেন। বিদুষী, সুন্দরী কাদম্বিনীর বিয়ের সময় বয়স ছিল ২১ এবং দ্বারকানাথের ৩৯।  দ্বারকানাথ ছিলেন তাঁর বিদ্যালয় জীবনের শিক্ষক, বিপত্নীক এবং দুই সন্তানের জনক। তাই, তাদের বিয়ের সময় ব্রাহ্ম সমাজে সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। বিয়ে মানতে না পেরে অনেক নিমন্ত্রিত ঘনিষ্ঠজনই নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি। কিন্তু, কাদম্বিনী-দ্বারকানাথের দাম্পত্য জীবন ছিল ব্যতিক্রম।

 

কাদম্বিনী হয়তো এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছিলেন যিনি উদারমনস্ক এবং নারীস্বাধীনতার বুলি শুধু মুখে না আউড়িয়ে মনে-প্রাণে সে আদর্শে অটল থাকবেন। ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকাগোষ্ঠী একবার স্ত্রী স্বাধীনতাকে কটাক্ষ করে সরাসরি কাদম্বিনীকে ‘চরিত্রহীনা’ বলেছিলেন। দ্বারকানাথ ১৮৯১-এ মামলা করলেন শুধু কাদম্বিনীর জন্য নয়, সমস্ত নারী সমাজের জন্য! তিনি জয়ী হয়েছিলেন। ‘বঙ্গবাসী’র সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের একশো টাকা জরিমানা, ছ’মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। 

 

প্রথম নারী হিসেবে মেডিকেল জীবন সংগ্রাম এবং যুদ্ধজয়

যেসময় ঘরের বাইরে বের হতেই বেশিরভাগ নারী আড়ষ্ট বোধ করতেন সেসময় উপমহাদেশে প্রথম নারী চিকিৎসক হওয়ার সফরটা কাদম্বিনীর জন্য মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রথমবার কাদম্বিনীর আবেদনে সাড়া না দিলেও বিএ পাশ করার পর ১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী পুনরায় আবেদন করেন। বিয়ের কিছুদিন পর তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু, মেডিকেল কলেজের প্রফেসরদের একাংশ ছাত্রী ভর্তি হওয়ার বিপক্ষে অবস্থান করে। এর ফলস্বরূপ তাঁকে এমবিএ বা ব্যাচেলর অফ মেডিসিনের ফাইনাল পরীক্ষার এক বিষয়ের মৌখিক পরীক্ষায় এক নম্বরের জন্য এমন একজন প্রফেসর ফেল করিয়েছিলেন। তখন অধ্যক্ষ জে এম কোটস কাদম্বিনীর সাথে অন্যায় হচ্ছে বুঝতে পেরে নিজের অধিকারবলে কাদম্বিনীকে ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি উপাধি দেন। 

 

১৮৮৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের পড়াশোনা শেষ করে তিনি তখন থেকেই প্রাইভেট প্রাকটিস শুরু করেছিলেন। ইডেন হাসপাতালে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন কোটস। কিন্তু যেহেতু ডাক্তারির এমবি বা এলএমএসের ডিগ্রি তাঁর ছিল না, তাই সেখানে তাঁকে নার্সের মর্যাদা দেওয়া হত। রোগ নির্ণয় বা অস্ত্রোপচার করতে দেওয়া হত না। ১৮৯০-এ তিনি লেডি ডাফরিন হাসপাতালে চাকরি পান। বেতন হয় তিনশো টাকা। কিন্তু, সমাজের এক পক্ষ এমবিএ ডিগ্রী না পাওয়ায় তাকে ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব দেয়াটাকে বিদ্রূপ শুরু করল। এরপর তিনি জেদ করে বিলেত গিয়ে ডাক্তারী ডিপ্লোমা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

 

পেশাগত জীবন সংগ্রামের জন্য কাদম্বিনী সংসারজীবনের দায়িত্ব পালনে কোন কার্পণ্য করেননি। বিলেত যাওয়ার জন্য টাকার সংস্থান, বিদেশে থাকার ব্যবস্থা ও দেশে নিজের আট সন্তানের দেখাশোনার ব্যবস্থা করে তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন। স্বামী দ্বারকানাথের প্রথম পক্ষের মেয়ে বিধুমুখী ও তাঁর স্বামী উপেন্দ্রকিশোরের দায়িত্বে বাকি সন্তানদের রেখে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন।

 

বিলেত যাওয়ার পাথেয় সংগ্রহ করেছিলেন শিকাগো মহাসম্মেলনের প্রদর্শনীতে ভারতীয় মহিলাদের শিল্পকর্ম পৌঁছে দেওয়ার কাজ নিয়ে। কাদম্বিনীর কাঙ্ক্ষিত ডিপ্লোমাগুলি ছিল এলআরসিপি, এলআরসিএস এবং এলএফপিসি। ক্লাস করতেন এডিনবরায়। ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে স্কটিশ কলেজের তিনটি ডিপ্লোমা লাভ করেছিলেন। কলকাতায় ফেরার পরে ‘বামাবোধিনী’ বা ‘ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার’-এর মতো কাগজগুলি তাঁর তুমুল প্রশংসা করেছিল। কিন্তু বিরোধিতায় ইতি পড়েনি তখনও। চিকিৎসক কাদম্বিনী তাঁর যোগ্যতার পদ বা চাকরি পাননি। কিছু দিন ডাফরিন হাসপাতালে সিনিয়র ডাক্তারের চাকরি করে ইস্তফা দিয়ে নিজের বাড়িতে চেম্বার খুলে পুরোপুরি প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন। পরে পসার জমে উঠেছিল দ্রুত।  

এক অসামান্যা মুক্তিপ্রেমী নারী যখন স্নেহময়ী জননী

কথায় বলে ‘ যিনি রাধেন তিনি চুলও বাঁধেন’। কাদম্বিনী এই প্রবাদবাক্যকে ছাড়িয়ে গিয়ে নারীর যোগ্যতাকে আরো অনেক উপর স্তরে প্রমান করেছিলেন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি পারিবারির জীবনেও তিনি ছিলেন সমুজ্জ্বল। দ্বারকানাথের প্রথম পক্ষের মেয়ে বিধুমুখীর ছেলে সতীশচন্দ্র রিকেটরোগী ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল। শোনা যায়, এই ছেলের চিকিৎসার যাবতীয় ভার নিয়েছিলেন বিমাতা কাদম্বিনী। সুস্থ করতে নিজের হাতে সোনা ব্যাঙের ঝোল রেঁধে সতীশকে খাওয়াতেন। এছাড়া কাদম্বিনী-দ্বারকানাথ দম্পতির ঘরে আরো আট সন্তানের আগমন ঘটেছিল। ব্রাহ্মসমাজের রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে শান্তাদেবী লিখেছিলেন, 

‘‘তিনি ব্রাহ্মসমাজের উৎসবাদিতে আমাদের বাড়িতে আসতেন। …কাদম্বিনী ভাল ডাক্তার ছিলেন এবং খুব কড়া কড়া কথা বলতেন, অপ্রিয় সত্য বলতে ভয় পেতেন না। নিজের ছেলেমেয়েদেরও বাদ দিতেন না।’’ 

আবার একই সঙ্গে ছিলেন স্নেহময়ী, যত্নশীলা মা ও দিদিমা। স্নেহময়ী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না, রুচিশীলা কাদম্বিনী পারিবারিক জীবনে ক্যারিয়ারকে কখনোই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে দেননি।

সামাজিক প্রেক্ষাপটে কাদম্বিনীর অবদান

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে নারী সমাজের সকল বাধাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে উপমহাদেশে নারী স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছেন সমাজে তাঁর অশেষ অবদান আলাদাভাবে স্বীকার করার আর প্রয়োজন হয় না। কাদম্বিনী ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও জড়িয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা প্রতিনিধিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। কলকাতায় টিভোলি গার্ডেনে কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে অংশ নিয়ে ধন্যবাদজ্ঞাপক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সত্যাগ্রহ আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ-বয়কট আন্দোলনেও অংশ নেন তিনি।

সেসময়কার নেপালের রাজা জং বাহাদুরের মাকে সুস্থ করে পুরস্কার হিসেবে প্রচুর অর্থ, দামি পাথর বসানো সোনার গহনা, মুক্তোর মালা, রুপোর বাসন, তামা-পিতল-হাতির দাঁতের জিনিস আর একটি সাদা রঙের গোলগাল, জ্যান্ত টাট্টু ঘোড়া পেয়েছিলেন। সেই ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চেপেই তিনি কলকাতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রোগী দেখতে ছুটতেন। রাস্তায় যাওয়ার সময়টুকু অনবরত লেস বুনে যেতেন! ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর এই ব্যতিক্রমী পথপ্রদর্শকের অভূতপূর্ব জীবনের অবসান ঘটে। মৃত্যুর পরে তাঁর ব্যাগে পাওয়া গিয়েছিল ভিজ়িটের ৫০ টাকা। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই চিকিৎসকের নিজের ভিজিটের টাকা দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল তার শেষ কৃত্য। আজীবন সাবলম্বী এই কালজয়ী নারী আমাদের প্রেরণা এখনও।

তথ্যসুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, বঙ্গদর্শন, যুগান্তর, ইনকিলাব। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *