follow us at instagram
Tuesday, September 22, 2020

স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীদের অধিকার নিয়ে ঐতিহাসিক রায়

স্বামীর সব সম্পত্তির ভাগ পাবেন হিন্দু বিধবারা, ঐতিহাসিক রায় ঢাকা হাই কোর্টের।
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2019/11/images-2-1.png

সাবিত্রী দেবী ((ছদ্মনাম)  বাড়ির আদুরে কন্যা ছিল। হাসি খুশি জীবনে ২১ শে পা দিতেই বরের হাত ধরে চলে স্বামীর ঘরে। সাবিত্রীর বিয়ের দিনে পিতার বাড়ি থেকে অধিকারহীন হয়ে যেতে হয় স্বামীর ঘরে৷ দেব বাড়িতে সে জন্মেছে , বড় হয়েছে কিন্তু পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার শুধু তার দাদাদের। বিয়ের দিন মায়ের আঁঁচলে পিতৃঋন শোধ করে সাবিত্রীর স্বামীর বাড়ি যাওয়া কতটা বেদনার তা বুঝে কেবল হিন্দু নারীরা।

বাংলাদেশে মুসলিম  নারীরা  পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে ভাগ পায়। ভরনপোষনের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর আইনী বিধান। খ্রিস্টান নারীদের  ক্ষেত্রেও একই অধিকার রয়েছে। কিন্তু দেশের হিন্দু  নারীদের পিতা মাতার  সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আর হিন্দু আইনের   বিধান এ বাধা তৈরি করেছে নারীদের জন্য। তবে ভারত ও নেপালে  হিন্দু আইন সংশোধন করে পিতার সম্পত্তিতে মেয়ের অংশীদার নিশ্চিত করেছে ১৯৫৬ সালে।
পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হিন্দু  নারীরা স্বামী  বাড়িতে  বিধবা হয়ে  শুধু মাত্র বসবাসের জন্য ভিটা পায়।
নারী জীবনে এ কত বড় বঞ্চনা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ দেশের হাজারো  বিধবা হিন্দু নারী পিতা ও স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে এভাবে জীবন যাপন করছে তার ইয়ত্তা নেই। যা দেখে মনে হয়, সত্যি নারী হয়ে জন্ম নেয়া মানে ঠিকানাবিহীন পরগাছা।
দীর্ঘ সময় পর দেশের হিন্দু  বিধবা নারীদের  অধিকার  প্রতিষ্ঠায় নতুন আলোর বাতি জ্বালিয়েছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট গত ২ সেপ্টেম্বর এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে।  সে রায়ের আলোকে এখন থেকে  হিন্দু বিধবা নারীরা স্বামী কৃষি জমিতে অংশ পাবে। এক কথায় একটি আইনের বিধান হয়ে যায় না বলে,এ রায় নিয়ে নানা প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়।
একজন হিন্দু বিধবা স্বামীর সম্পত্তির কতটুকু অংশ পাবে কিংবা কিভাবে কোন অবস্থায় সে তার অংশ দাবী করবে তা নিয়ে আইন প্রনয়নের জন্য সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।  তাই এ বিশদ বিষয়াদি জানতে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে পূনাংগ রায় পাওয়া পর্যন্ত। একই সাথে আইনের বিধানের জন্য।
এছাড়া শুধুমাত্র যুগান্তকারী এ রায় দিয়ে হিন্দু নারীরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে কিনা সেটা ও একটি বড়  প্রশ্ন।  এ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগে আপিল করে এবং  আপিলের রায় যদি  হাইকোর্টের রায়কে সমর্থন করে তাহলে হিন্দু নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে এ রায়ের মাধ্যমে। তাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা  আপিল বিভাগের রায়কে সম্মান জানিয়ে বিদ্যমান ১৯৩৭ সালের আইনকে সংশোধন করে  হাইকোর্টের এ রায়ের মাধ্যমে হিন্দু নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ।                       
যে  ঘটনা বহুল মামলার আলোকে  হিন্দু বিধবা নারীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য  যুগান্তকারী রায় পেয়েছে  তা  হলো,
“খুলনার রাজবিহারী মণ্ডলের দুই ছেলে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল ও অভিমান্য মণ্ডল। অভিমান্য মণ্ডল ১৯৫৮ সালে মারা যান। এ অবস্থায় মৃত ভাইয়ের স্ত্রী (গৌরী দাসী) কৃষিজমি পাবেন না, শুধু বসতভিটা থেকে অর্ধেক পাবেন-এমন দাবি নিয়ে ১৯৮৩ সালে নিন্ম আদালতে (খুলনার সাব অর্ডিনেট জজ কোর্ট) মামলা করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ। তবে মামলায় পক্ষ যথাযথভাবে না করায় ১৯৯৬ সালে তা খারিজ করে রায় দেন আদালত। যদিও ওই আদালত গৌরী দাসীর কৃষি জমির সম্পত্তি পাবেন না বলে পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন।
আইনজীবীর তথ্য অনুসারে, খারিজ করে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন জ্যোর্তিন্দ্রনাথ মণ্ডল। ২০০৪ সালে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে বসত ভিটা ও কৃষি জমিতে গৌরী দাসীর অধিকার থাকবে বলা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে রিভিশান আবেদন করেন জ্যোতিন্দ্র নাথ মণ্ডল। এই রিভিশন আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে হাইকোর্টে  কৃষি জমিতে গৌরী দাসীর অধিকার  থাকার পক্ষে রায় দেয়।
১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইন অনুসারে স্বামীর কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতে বিধবা নারীর অধিকারে কথা আছে। তবে ১৯৪১ সালের ইন্ডিয়ান ফেডারেল কোর্টের রায় অনুযায়ী কৃষি জমিতে বিধবার অধিকার না দেওয়ার কথা রয়েছে।ফেডারেল কোর্টের রায় এতদিন ধরে অনুসরণ করা হতো। তবে ১৯৩৭ সালের ওই আইনটি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গ্রহণ করে। দেশের আইনি পরিকাঠামোর মধ্য থেকেই কৃষি-অকৃষি উভয় ধরনের সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীরা অধিকার পেতে পারেন বলে শুনানিতে বলেছেন আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক ।
সার্বিক চিন্তা ভাবনায় দেশের রাষ্ট্র কাঠামো বিবেচনায় ফেডারেল কোর্টের ওই রায় প্রযোজ্য নয়। হিন্দু বিধবা নারীর কৃষি-অকৃষি উভয় সম্পত্তিতে অধিকার থাকবে বলে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন এ মামলার রায়ে। বস্তুত  জজ আদালত যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।” আদালতে জ্যোতিন্দ্র নাথ মণ্ডলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. আব্দুল জব্বার। গৌরী দাসীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ নাফিউল ইসলাম। এ ছাড়া অ্যামিকাস কিউরি (আদালতে আইনি সহায়তাকারী হিসেবে) শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম আশরাফুল হক জর্জ।
তবে নতুন যে আইন পাস করে আদালত দৃষ্টন্ত স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন, সে বিষয়ে কি ভাবছি আমরা? একটি নারী বিধবা হওয়ার পর স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী হবে। তার আগে তার আর কি অধিকার পাবে না? কোন সিদ্ধান্ত কি থাকবে তার মতামতের? এসব বিষয়ে জটিলতা মুক্ত একটি আইন হোক এটাই প্রত্যাশা।
সূত্র – প্রথম আলো, ডয়েচভেল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *