follow us at instagram
Tuesday, October 27, 2020

নাজমা আনোয়ার-দেশের প্রথম তিনজন নারী স্থপতিবিদের একজন

বাংলাদেশের প্রথম তিনজন নারী স্থপতিবিদের একজন- নাজমা আনোয়ার। 
https://taramonbd.com/wp-content/uploads/2020/09/Louis-I-Kahn-with-poineering-females-in-Architecture-BUET.jpg
Image Source: contextbd.com

সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বাবার ঘরময় ছড়িয়ে থাকা নকশা কুঁড়িয়ে শখের আঁকিবুঁকি করা বাচ্চা মেয়েটিই পরবর্তীতে হয়ে যান বাংলাদেশের প্রথম তিনজন নারী স্থপতিবিদের একজন- নাজমা আনোয়ার। 

স্থপতিবিদ নাজমা আনোয়ার ১৯৪৩ সালে রাজশাহীতে জন্মগ্রহন করেন। বাবার চাকরি সূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার শৈশবকাল কাটে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েট) “ফ্যাকাল্টি অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্লানিং” বিভাগ খোলা হলে একই বছর প্রথম ব্যাচের প্রথম তিনজন ছাত্রীর একজন হিসেবে তিনি ভর্তি হন। 

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের বর্ণীল সময়

স্থাপত্য বিভাগের ছাত্রী হিসেবে সেসময় রায়ের বাজারের কুমোরপাড়ায় মডেল করার জন্য মাটি কিনতে যাওয়া, পুরাণ ঢাকার সিরাজউদ্দৌলা পার্কে পিসবোর্ড কেনা, ল্যান্ড প্ল্যানিং এর অফিসে ধরনা দিয়ে বিশেষ মৌজার নকশা সংগ্রহ করা, আমেরিকান এক্সপ্রেস বিল্ডিং এর ছাদে উঠে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছবি আঁকা, কার্পেনট্রি ক্লাসে করাত দিয়ে কাঠ কেটে বিভিন্নরকম কাজ করা, ব্লাকস্মিথ ক্লাসে লোহা কাটা, ঝালাই করা, ড্রিলিং করা, শীতের দিনে দিনভর রোদে পুড়ে সার্ভে ক্লাস এটেন্ড করার মত হরেক কাজের ভেতর দিয়ে এক বর্ণিল সময় পার করেছেন তিনি। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আমেরিকান আর্কিটেক্ট সি বুরম্যান, মি. ওয়াল্ডেন, মি. ডানহাম এবং শিল্পী হামিদুর রহমানকে। সি বুরম্যান ছিলেন ফ্যাকাল্টির ডিন। মি. ওয়াল্ডেন শেখাতেন ডিজাইন। মি. ডানহাম ও শিল্পী হামিদুর রহমানের কাছ থেকে বেসিক ডিজাইনের পাঠ নিতেন। মাঝেমধ্যে ডানহাম শিক্ষার্থীদের বাইরে নিয়ে যেতেন বিশেষ বিল্ডিং দেখাতে ও ছবি আঁকতে। হামিদুর রহমান একদিন তাদের রমনা পার্কে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন বিভিন্ন রকমের পাতার স্কেচ করতে, এক মিনিটে একটা করে। 

হাসি-আনন্দ-পরিশ্রমে ভরপুর এমনি বর্ণিল ১০ টি সেমিস্টার পাড়ি দিয়ে নাজমা আনোয়ার ১৯৬৭ সালে স্থাপত্যে এ দেশের প্রথম গ্রাজুয়েটদের একজন হয়ে বের হয়েছিলেন।     

স্থাপত্যবিদ হিসেবে যাত্রা

আধুনিক স্থাপত্যের পুরোধা মাজহারুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান “বাস্তুকলাবিদ” নামের প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দিয়ে শুরু করেন চাকরি জীবন। পরে তিনি বিশ্ববিখ্যাত স্থাপত্যবিদ পল রুডলফ এর সাথে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে স্থাপত্যবিদ হিসেবে কাজ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচারাল কমপ্লেক্স’ ও মেয়েদের ‘সুলতানা রাজিয়া হল’ তার নকশায় নির্মিত হয়েছে।

 

এর পর তিনি প্রায় ১৫টি সরকারি ও ব্যক্তিগত ভবনের নকশা করেছেন। এগুলোর মধ্যে তার গুলশানের পৈতৃক ভবন অন্যতম। এ ভবনের বাইরের উন্মুক্ত দেয়ালগুলো করা হয়েছিল পুড়ে যাওয়া নীলচে ঝামা ইট দিয়ে। আর ইচ্ছেমতও কাজ করার স্বাধীনতা পেয়ে নানা রকমের নিরীক্ষা এখানে তিনি করেছিলেন। পরে বিবাহিত জীবনে সাংসারিক ব্যস্ততায় কিছুকাল চাকরি জীবন থেকে ইস্তফা দিয়ে স্বাধীন ও এককভাবে কাজ করেন।

নাজমা আনোয়ার, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে প্রতিকূল পরিবেশে নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের অনুপ্রেরণার উৎস। সেসময়ে শাড়ি ও হিল পড়ে তিনতলা কনস্ট্রাকশন সাইটে দড়ি বেয়ে ভিজিট করতে যাওয়া নারীকে দেখে সাধারণ মানুষ অবাক হলেও তিনি তার প্রাপ্য সম্মান ঠিকই আদায় করে নিয়েছিলেন।   

সময়ের স্রোতে বহমান বর্তমান জীবন

বর্তমান ৮০ বছর বয়সী নাজমা আনোয়ার এখন পরিবার নিয়ে বাস করছেন আমেরিকার নিউইয়র্কে। বিয়ে করেছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে। এ দম্পতির ঘরে তিনজন মেয়ে সন্তান আছেন। পারিবারিক ভাবে সুখী এ স্থপতি বিদ তার স্বামী এবং পরিবারকেই তার সকল সফলতার মেরুদণ্ড হিসেবে দেখেন।  

সময়ের স্রোতে কাজ থেকে অবসর নেয়া বয়স্ক এই পথিকৃৎ নিউইয়র্কে এখন একটি সুন্দর পারিবারিক জীবন কাটাচ্ছেন। মাঝে মাঝেই বিশ্ববিখ্যাত আর্কিটেক্টদের স্থাপনা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। 

বাংলাদেশের নারী স্থপতি বিদ নাজমা আনোয়ার শুধু জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই নয়, সে জীবনকে উপভোগ করারও পথ দেখিয়েছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *